Monday, 8 March 2021

চোরাবালি

 জানলা থেকে বাইরের দোদুল্যমান বিশাল গাছটার দিকে তাকাতেই ওর মনে পড়ে গেল যে ও একদিন স্বপ্ন দেখেছিল যে ওর এই চোখটা একদিন বাইনোকুলারের কাঁচের এপার থেকে দেখবে সাদা বরফে ঢাকা অজস্র পাহাড় যার কোনো একটা দিয়ে ঝরে পড়বে রূপলী জলস্রোত যা ওর ছোট্টো ঘরটার পিছন থেকে বয়ে যাবে। খানিকক্ষণ স্তব্ধ থেকে ও ধীরে ধীরে কল্পনায় ভেসে গেল," সারাদিনের খাটনির পর যখন ও ওর ছোট্টো একতলার ঘরের বাইরের সামনের দুপাশের বাগান শেষে কাঠের দরজাটা ঠেলে বাগানের চৌহদ্দিতে পা দেবে, তখন হয়তো একটা দমকা হাওয়ায় ওর মনে পড়বে কিছু পুরোনো কথা" । হঠাৎ ওর তন্দ্রা ছুটে গেল ঠাম্মার ভর্ৎসনায়। ও ফিরে এল ক্রূঢ়বাস্তবে, ওর মনে পড়ল কী ভাবছে ও? ভাবনার জগতে ভাসতে ভাসতে ভুললো নাকি ও সব? ও কি ভুলল ওর বাড়ি কোনো পাহাড়ের পাদদেশে নয়, ও থাকে কলকাতার একটি জঞ্জালে, যার আকাশ বলতে খোলা জানলার বাইরের এই গাছটা। ভাবতে ভাবতে ওর নিশ্বাসটা বন্ধ হয়ে এল। ইচ্ছা করল এক ধমকে থামিয়ে দেবে প্রত্যেকটা মানুষের মুখ। তারপর নিজেকে সংযত করতে গিয়েই ও কেঁদে ফেলল। আর ওর ওপর বর্ষণ হল হাজারো প্রশ্নের বারি। যার কোনো উত্তর ওর কাছে ছিল না, নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না।

এইরকম অসামঞ্জস্যতার মধ্যে দিয়েই চলছিল ইচ্ছের জীবন। যেখানে ওর মনের ভাষা বোঝার মতো কেউ ছিল না। অন্যদিকে একই পরিস্থিতিতে জড়িয়ে ইন্দ্রিকাও খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজের মুক্তির পথ। দুটো অচেনা শরীর, কষ্ট এক। 

দুজন এমনি দুজনকে চেনে না। ইচ্ছে উচ্ছাসের মুখে ইন্দ্রিকার নাম শুনেছে বারকয়েক। আর অবাক হয়ে ভেবেছে কিভাবে সম্ভব এত মিল? কিন্তু ও ভালোই বুঝেছিল যে, ইন্দ্রিকা তার মতো মুখ বুঝে সব সহ্য করে না। 

সারাদিনের খুটিনাটি ইচ্ছের কাছে গল্প না করলে উচ্ছাসের দিন পেরত না। ইচ্ছেও উচ্ছাসকে না জানিয়ে কিছু করতনা। তাই দিনের শেষে দুই বন্ধু একে অন্যের অভিজ্ঞতা চারণ করে নিত। সেই সুবাদেই ইন্দ্রিকার কথা শুনে ইচ্ছে মনের মধ্যে ইন্দ্রিকার একটা ছবি সাজিয়ে ফেলেছিল। উচ্ছাস ইন্দ্রিকাকে বড্ডো ভালোবাসে। 

যখন ঠাম্মার প্রশ্নে জড় জড়িত হয়ে ও টঠস্ত, সেই সময়েই ওর পাশ থেকে বেজে উঠলো," আমি তোমারো বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস"। এতদূর বাজার পরই ইচ্ছের চোখ গেল পাশে পড়ে থাকা ফোনের দিকে। ও জানত ফোনটা উচ্ছাসই করেছে, কারণ সে ছাড়া কেউ আজও পর্যন্ত এত ঠিক সময়ে ওকে ফোন করেনি। কিন্তু না, আবারও নিজেকে অসহায় অনুভব করল ও! ফোনটা এসেছে একটা অচেনা নম্বর থেকে। মুহুর্তে ওর চোখের চাহনি বদলে গেল। ওর ভাবতেই বিরক্ত লাগল যে হয়তো ফোন তুললেই ওপার থেকে ভেসে আসবে কোনো কোম্পানির ফোন যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হল ভুল সময়ে ফোন করে ওর ব্যক্তিস্বাধীনতা নষ্ট করা। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বারোর হিসাব না মিলিয়েই মুখটাকে বাংলার পাঁচ করে হ্যালো বলার পরই ও স্তব্ধ হয়ে গেল। ওদিক থেকে কথা ভেসে এল, সে কি গভীর কন্ঠস্বর, যেন কথা বলার ভঙ্গি শুনেই মানুষটার চেহারার বর্ণনা করতে পারবে ও। মানুষটা ওপার থেকে এবার খানিকটা ইতস্তত হয়ে বলল," ইচ্ছে, আমি ইন্দ্রিকা।" এতটুকু শুনেই ও নিজের মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন বেঁধে ফেলল। ও প্রশ্নগুলো নিজের মনে চালাচালি করছিল এমন সময় ইন্দ্রিকা ওর উত্তেজনায় বাঁধ দিয়ে বলল, “ আসলে উচ্ছাস আমায় একবার তোমার সাথে কথা বলতে বলল, ওকে অনেক বুঝিয়েছি যে আমি চাইনা কোনো সম্পর্ক, বিশ্বাস করতে চাইনা কাউকে। তাও ও অবুঝের মতো জেদ করল, বলল আমি যেন একটিবার তোমার সাথে কথা বলি। তাহলে নাকি আমার মতামত বদলে যাবে"। আড়াই মিনিট কথা বলার পর ইন্দ্রিকার সাথে দেখা করার দিন, সময় সবটা ঠিক করে ফোনটা রেখেই ওর চোখ গেল ওর ঠাম্মার দিকে। তাঁর চোখ দুটো যেন প্রায় কৌতুহলী দৃষ্টি দিয়ে গিলে খেতে এল ওকে। লেকের ধারে বসে ইচ্ছের জন্য অপেক্ষা করতে করতে লেকে আবহমান বাতাস ও জলস্রোতের সাথে সবেই ভেসে যাচ্ছিল ইন্দ্রিকা, হঠাৎ ওর চোখ গেল অদূরে ক্ষনিকের  জন্য তৈরি হওয়া একটা জটলায়। একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে ওর খানিক দূরে বসে থাকা জুটির সামনে এসে দাঁড়ালেন, মেয়েটির হাত ধরে টেনে তুললেন আর ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন," প্রয়োজন ও সাহস থাকলে পরের বার থেকে ঘরে এসে ওর সাথে দেখা করে যাবে!" এই বলে সে মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেলেন। দৃশ্যটা দেখে ইন্দ্রিকার গত পড়শু রাতের কথাটা মনে পড়ল। তখন রাত ৯'টা, বাইরের প্রবল ঝড়বৃষ্টির জন্য বাড়ি ফিরতে না পেরে যখন ও বাবাকে ফোন করল, ফোনটা দুবার বেজে গেল ওপার থেকে কোনো উত্তর এল না। রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে দেখেছিল বাবা খেয়ে দেয়ে ঘুমাচ্ছে আর পিসি রুটি বানাতে বানাতে কেনো দেরি হয়েছে সেটাই জানতে চাইছে করুন সুরে। ওর বাবাকে দেখেই রক্ত চড়ে গেল ওর মাথায় আর সেই রাগ গিয়ে পড়ল পিসির ওপর। মাথা ঠান্ডা হতে পিসিকে সব ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে ওর দম বেরিয়ে গেছিল সেদিন। ঘটনাটা মনে পড়তেই 'বাবা' শব্দটায় হাসি পেল ওর। নিজের জীবনের এই অসাধারণ স্রোতের কথাই ভাবছিল বসে বসে, হঠাৎই কেউ পিছন থেকে ডাকল ওকে। ডাকটা শুনেই ওর মনে হল কতকাল কেউ ওকে এত আদর আর যত্ন ভরা সুরে ডাকেনি। তবে হ্যাঁ, উচ্ছাসের ডাকেও এই হৃদ্যতা থাকে। কিন্তু ইন্দ্রিকার মন কিছুতেই তা বিশ্বাস করার সাহস দেখায় না। ওর মন জানে যে সময়ের সাথে সাথে উচ্ছাসও একদিন ওর বাবার মতো ঔদাসিন্য দেখাবে। ভাবতে ভাবতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ওরই বয়সী একটা মেয়ে। স্বাস্থ্য দেখে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে মনে হলেও চোখে যেন সুখ নেই বলে মনে হল। কিন্তু হাসিটা বড্ডো মিষ্টি, যেন কতদিনের চেনা। ইন্দ্রিকা ঘাড় ঘোরানো মাত্রই ইচ্ছের হৃদকম্পনটা কেমন যেন বেড়ে গেল। পরবর্তী দেড় মিনিটে যখন ইন্দ্রিকা নিজের পরিচয় দিয়ে ওর বিষয়ে জানতে চাইছিল তখন ও একটা ঘোরের মধ্যে হারিয়ে গেল ইন্দ্রিকার চোখের গভীরতায়। ফোনে যে গভীরতার আঁচ ও পেয়েছিল সামনাসামনি তা আরও প্রবল। চোখগুলো বড়ো নয়, কিন্তু কি যেন একটা মায়া তাতে, ও বুঝল না। কোমর ছাড়িয়ে লম্বা লম্বা চুল গুলো হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে,তার সাথে ইচ্ছের সব কষে আসা হিসাবও।

             ইন্দ্রিকার ঝাঁকুনিতে ইচ্ছে আবার ফিরে এলো বাস্তবে,আর নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে হু হু করে বলে ফেলল নিজের অতীত,বর্তমান সব,কিভাবে ওর বাবার অতিরিক্ত শাসন ওর দম বন্ধ করে দেয়,কিভাবে ওর মা পরোক্ষ ভাবে ওর উপর সব বিষয় চাপ সৃষ্টি করে,কিভাবে ৫বছর আগে ওর বনির চলে যাওয়ার পর থেকে ও একা......... সব সব সব......ও বলা শেষ করে ইন্দ্রিকার দিকে তাকাতেই খেয়াল করল ইন্দ্রিকার ঠোঁটের কোণে হাল্কা হাসি আর চোখের কোণে জল। এই কান্না মেশানো হাসি হয়তো এটাই ভেবে, যে দুজনের পরিস্থিতি কত আলাদা তাও ওদের মানসিক অবস্থার কি অপরিসীম মিল।

পরশু রাতের কথা টা ইন্দ্রিকার আবার মনে পড়ে গেল,ও কিছু বলতে যাবে এমন সময় ইন্দ্রিকা ওকে জড়িয়ে ধরে ভেঙে পড়ল।গত তিন বছরে শক্ত করে জমিয়ে রাখা সব ক্ষতের ঠিকানা খুঁজে পেল হয়তো ওর একা হৃদয়টা।               

 পাক্কা পৌনে তিন ঘণ্টা গল্প করার পর যখন সবেই দুজনে একসাথে উচ্ছাসের নাম উচ্চারণ করল,ঠিক সেই সময়েই ইচ্ছের ফোনে ওর নাম টা উজ্জ্বল হয়ে উঠল....ফোন বাজল....আর দুজনেই একসাথে হো হো করে হেসে উঠল।

ফোন তোলা মাত্রই উচ্ছাসের হম্বিতম্বি শুরু, ''কি রে? কোথায় তুই?কটা বাজে? ইন্দ্রিকা কই?তুই জানিস না এই সময় তুই আমার সাথে থাকিস?ইন্দ্রিকা কে পেয়ে আমায় ভুললি? বাঃ রে বাঃ''....ইন্দ্রিকা ওর হাত থেকে ফোন টা নিয়ে হাসতে হাসতে ব্যঙ্গ করে বলল, "ইচ্ছে আমায় তোর থেকে অনেক বেশি ভালোবাসে" বলেই মুখ ভেঙিয়ে ফোন টা কেটে দিল।

আর দুজনেই হাত ধরাধরি করে হেসে লুটোপুটি খেল। এত প্রাণ খোলা হাসি ওরা কত বছর হাসেনি, একে অন্যের হাত ধরে এইভাবে হাসতে হাসতে ওরা ভুলেই গেছিলো যে এই মুহূর্তে ওদের দুজন কে দুটো আলাদা রাস্তায় হাটতে হবে, এখন সত্যি একটাই, ইচ্ছের হাতের মুঠোয় ইন্দ্রিকার হাত, একটা শক্ত বাঁধন-পলকা ডোর।

 

            বাড়ি ফিরতেই উচ্ছাস হাজারো প্রশ্ন নিয়ে চড়াও হল ইচ্ছের উপর,"এতক্ষণ কিসের গল্প? খালি আমার নামে নিন্দে করলি? যে কাজে পাঠিয়েছিলাম তা তো কিছুই করিস নি!!!! ", তারপর একটু হেসে অন্যমনস্ক হয়ে বলল, "কিন্তু জানিস এই দেড় বছরে এই প্রথমবার ওকে আমি এত হাসিখুশি দেখলাম, কি করলি রে তুই?যে ও হঠাৎ এত বদলে গেল? এতদিনে কোনোদিন ও আমার সাথে এইভাবে হেসে কথা বলেনি", তারপর ইচ্ছের হাত ধরে বলল," তুই পারবি ওকে বোঝাতে,তুই ওকে বোঝানা যে আমি ওর বাবার মত করব না! আমি ওকে খুব ভালোবাসি"

কথা টা শুনে ওর মনে পড়ে গেল সেই মুহূর্তটা, যখন ইন্দ্রিকা ওর ছায়ায় মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল, যখন ওরা একে অন্যের হাত ধরে হাসছিল অন্তর থেকে, তারপর জোরে জোরে মাথা নাড়ল দুবার, যেন ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল ওর ভাবনাগুলোকে। তারপর উচ্ছাসকে বলল,"শোন, দায়িত্ব যখন দিয়েছিস ভরসা রাখ,ছটফট করে আমার মাথা চিবিয়ে খাস না। ভালো কিছু করবি তবে না বলব, হুঁ.... এখন যা.....দূর হ....."

এরপর কেটে গেল চারমাস, এই চারমাসের প্রায় একশো বাইশ দিনে ইচ্ছে আর ইন্দ্রিকা প্রায় পঞ্চাশ দিন ঘুরে বেড়িয়েছে কলকাতার অলিতে গলিতে, কখনও অফিসের পর,কখনও কোচিনের পর,ইন্দ্রিকা ইচ্ছেকে ছাড়া এক মুহূর্তও কল্পনাও করতে পারে না আর এই চার মাসেই ইচ্ছের দৌলতে উচ্ছাস আর ইন্দ্রিকা কাছে এসেছে অনেকটা, ইন্দ্রিকার মনের ভয়টা আর নেই, সেও এখন একটু একটু করে ভালোবাসছে উচ্ছাসকে। কিছুদিন পর ইচ্ছে জানলার বাইরে চেয়ে বসেছিল। হঠাৎই উচ্ছাস ছুটে এলো, ওর মুখে আজ অন্যরকম হাসি।

দৌড়ে এসে প্রথমে ইচ্ছে কে জড়িয়ে ধরল তারপর ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,"ইন্দ্রিকা আজ আমায় হ্যাঁ বলেছে"। কথাটা বাজের মত গিয়ে পড়ল ইচ্ছের কানে,ওর মনে পড়ে গেল প্রথম দিনের 'ইচ্ছে আমি ইন্দ্রিকা' থেকে কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত ওর হাতের মুঠোয় ইন্দ্রিকার হাতের স্পর্শের কথা...... তখন আর ওর হৃদস্পন্দন চলছে না ঠিক করে। সবটাই যেন নিস্তব্ধ।


     কোথা থেকে আসছিল কষ্টগুলো?

চোখের জল লুকাতে পিছন ফিরল ও আর হাসতে হাসতে বলল,"দেখ রে দেখ কি ক্ষমতা আমার.....দেখ শুধু...এবার অন্তত একটা ট্রিট দে ভাই"।

উচ্ছাস আজ গম্ভীর, বলল,"তুই সত্যিই এটা করতে পারলি?! যে মেয়েটা আমাকে বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছিল তাকে তুই....!!কি করে পারলি ইচ্ছে?" ইচ্ছে একটা উদ্ধত দৃষ্টি দিয়ে বলল,"যদি ওর প্রতি তোর ভালোবাসাটা মিথ্যে হত, তাহলে আজ ইন্দ্রিকাকে তোর থেকে ছিনিয়ে নিতাম"

উচ্ছাস একটু অপ্রস্তুত হয়ে কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,"যাহ.... আমি আজই সিরিয়াস,আর তুই আজই এরকম মজা করছিস....তুই ওইরকম নাকি?" ইচ্ছে অম্লান নিশ্চল চোখে বলল, "যদি হইও সেটা কি দোষের হবে?" কিছুক্ষণ সময় থমকে গেল... ইচ্ছে অট্টহাস্য হেসে বলল, "চল ভাগ এখান থেকে... যত আলফাল বকছিস... যা প্রেম কর গিয়ে" বলেই দরজাটা উচ্ছ্বাসের মুখের ওপর বন্ধ করে হাসতে হাসতে বিছানায় এসে বসল। উচ্ছ্বাসের বলা কথাগুলো মনে পড়ে উন্মাদের মতো হাসছে ও... তারপরই চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল, নিস্তব্ধ - নিশ্চল। আর দু'চোখের কোল বেয়ে ঝরে পড়ল ওর স্বপ্নের রুপোলী স্রোত। দশদিন পর রেল স্টেশনে সেই পুরনো দৃশ্য! ইচ্ছের হাতের মুঠোয় ইন্দ্রিকার হাত, রাত ন'টা, ইচ্ছে একটা চাকরি পেয়েছে সিমলার চা বাগানের মালিকের পি. এ.। উচ্ছ্বাস কান্না চেপে বলল, "জানোয়ার, বেইমান... পরশু আমাদের বিয়ে আর তুই চললি" বলেই কান্না লোকাতে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। ইন্দ্রিকা পাগলের মত কাঁদছে ওকে জড়িয়ে ধরে, ট্রেন হুইসেল দিতেই ওদের সেই শক্ত বাঁধন ছিঁড়ে গেল এক নিমেষে, ইচ্ছে চলে গেল। ইন্দ্রিকা মাঝ স্টেশনে বসে পড়ে কাঁদল আরও খানিকক্ষণ।  

   প্রায় তিন মাস কেটে গেছে, ইচ্ছে কাজ থেকে বাড়ি ফিরল, ওর স্বপ্নের সেই দৃশ্য আজ পূর্ণতা পেল। সেই কাঠের দরজা ঠেলে দু'পাশের বাগানের চৌহদ্দিতে ওর পা পড়তেই বাগানের ফুলের গন্ধে ও অনুভব করল ইন্দ্রিকার গন্ধ, ওর মনে পড়লো সেই কাটানো মুহূর্তগুলো... আজ ওর ঘরের ছ' ফুটের দক্ষিণের জানলার বাইরে দেখা যায় বরফে ঢাকা পাহাড় আর ওর স্বপ্নের সেই রুপোলী স্রোত... ইন্দ্রিকা আর উচ্ছাসের সাথে প্রায় রোজই কথা হয়। খুব ভালো আছে ওরা... ছোটখাটো খুনসুটি, ঝগড়াঝাটি নিয়ে। আজও ফোন করে দুজন দুজনের নামে নালিশ করল তারপর একসাথে হেসে উঠলো। আর ও ওদের জানালো যে মেঘার্ঘ ওকে জানিয়ে দিয়েছে যে ও যদি বিয়ে করতে না চায় তবে মেঘার্ঘ ওর সাথে এই ভাবেই থাকবে বাকি জীবনটা... কারণ ও ছাড়া নাকি পৃথিবীর কোন মেয়েই মেঘার্ঘের জন্য নয়...

 

                         সমাপ্তি.....

 


শরতিনী রায় ©

অক্ষর আত্মা

যেথা  আবেগশূন্য  নাশনালি  শ্বাসে  পূর্ণ ;

নামেমাত্র  বাতাস , লাইব্রেরিতে স্থির মৌচাকের বাস /

বিরক্ত কণ্ঠে  শূন্য এ ভাসা রাত ঘিরে আছে বহু অস্থির আতঙ্কের ভাব / কলমের ডগায়  একফালি স্বপ্ন, কোমল তো নয়,  কঠিন হাতের পরশে, কামনা বাসনা হারিয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে , একাকিত্বের আশেপাশে /

পাটীগণিতের  পাঠশালায় , নেত্রগোলকের নালায়েক আচরণ,  প্রযুক্তিতেও ঘুণ /ভগবানরা আজ মুক্ত ইলেকট্রিকের যুগে , চোখ বুজতে বলে কস্টিউম বদলে পিছু ডাকে/ মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সাত মহল সম অভিমান, 

ধারবাকির অভিযোগে  বেনামী সামিয়ানার তলদেশে, তুচ্ছ ব্রণের দাগ, বাউলের বাউন্ডুলে  স্বপ্ন ভ্রমরার গলিতে পচে গেছে / হাঁটু গেড়ে বসন্ত চাইছি, কোকিলের সুর কাঁধে নিয়ে  আমি ভগবান নয় মানুষ দেখেই অভ্যস্ত,  যা নির্মম ঘাতক, বেডকভারে এঁঠো ঠোঁটের ন্যায় চাতক / বালিচাপা  স্বপ্নে  নির্জন শুন্যে  কফিন কাহিনীর উল্লাসে ব্যথিত বুকে দুঃখ আছে শতরকম /প্রেম তো আর হলোনা, নিয়মও ভাঙলো না, জোনাকি লগ্নে গোছানো গেলোনা কিছুই আর তেমন, পরিশেষে পাইকারি স্বপ্নের  ঝাঁকে প্রয়াত  ধ্বংসাবশেষে  , জ্বলন্ত অক্ষরের  আত্মা সৃষ্টির কর্মে নিজেকে  সমর্পিত করলাম, উহ্য রেখে প্রাপ্তি/

 

দেবাশীষ বড়াল ©

 

 

 

Tuesday, 2 March 2021

চৌধুরি বাড়ির মূর্তি রহস্য

সকালবেলায় প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরে এসে নীলাদ্রি চা পান করছিল নিজের ঘরে। হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠায় , সে চাকর প্রহ্লাদকে বলল দরজা খুলতে। চাকর এসে জানাল-

-দাদাবাবু, ইন্সপেক্টর সেন এসেছেন, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।

নীলাদ্রি ইন্সপেক্টর সেনকে উপরের ঘরে পাঠিয়ে দিতে বললেন এবং আরেক পেয়ালা চা দিতে বললেন। ইন্সপেক্টর তাঁর ঘরে ঢুকলে, নীলাদ্রি তাঁকে চেয়ারে বসতে বলে সাতসকালে তাঁর আগমনের হেতু জানতে চাইলেন। ততক্ষণে প্রহ্লাদ এসে দুজনের জন্য চা দিয়ে গেছে। নীলাদ্রির এই একটাই নেশা হলো মাত্রাতিরিক্ত চা পান! তাই নীলাদ্রি এককাপ বললেও প্রহ্লাদ দু'পেয়ালা চা নিয়ে এলো।

চা শেষ করে ইন্সপেক্টর সেন বললেন-

-আর বলবেন না মশাই, ভালো জ্বালায় ফেঁসে আপনার শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছি। কলকাতার চৌধুরি বাড়ির নাম তো শুনেছেন, কলকাতার বনেদি বাড়িগুলির অন্যতম বাড়ি। তা হয়েছে কি, ২৫০ বছর আগে, চৌধুরি বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীঁ গৌরাঙ্গনাথ চৌধুরি পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় বাণিজ্য করতে এসে, কলকাতায় চৌধুরিদের  বর্তমান গৃহটি নির্মাণ করেন এবং পরবর্তীকালে পরিবারকে এখানে নিয়ে এসে বসবাস শুরু করেন। আসার সময় তাঁদের স্বর্ণনির্মিত কূলদেবী চন্ডীকার মূর্তিটি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে প্রতিবছর দূর্গাপুজোয় মহামায়ার সঙ্গে চন্ডীকা দেবীও পূজিতা হন। রথে কাঠামো পুজোর দিন, চন্ডীকা দেবীকে সিন্দুক থেকে বের করা হয়।

এইবছর রথের দিন সিন্দুক খুললে, সিন্দুক খালি অবস্থায় মেলে! এরপর চৌধুরি বাড়ির বর্তমান কত্তা গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি লালবাজারে যোগাযোগ করেন। কিন্তু, গোয়েন্দা বিভাগের কেউই কেস্ টা সলভ্ করতে পারছেনা, অগত্যা তাই আপনার কাছে আসা। আপনি যদি কেস্ টা নেন!?

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর ইন্সপেক্টর সেনকে জানাল- "আমি চৌধুরি বাড়িতে যেতে চাই।"

তক্ষুনি ইন্সপেক্টর এবং নীলাদ্রি চৌধুরি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল...

চৌধুরি বাড়িতে এসে নীলাদ্রি দেখল বাড়িটি দো'মহলা। বৈঠকখানায় তাঁদের বসিয়ে, বাড়ির চাকর গৌরিপ্রসাদ চৌধুরিকে ডাকতে গেলেন। গৌরিপ্রসাদ এলে, ইন্সপেক্টর সেন তাঁর সঙ্গে নীলাদ্রির পরিচয় করিয়ে দিল।

নীলাদ্রি দেখল গৌরিপ্রসাদ চৌধুরির বয়স ষাটোর্ধ্ব হলেও চেহারায় বনেদি ছাপ! কিন্তু তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মূর্তি নিরূদ্দেশের চিন্তায় তিনি কয়েক রাত বিনিদ্র কাটিয়েছেন।

চৌধুরি মশাই নীলাদ্রিকে দেখে, তাঁর হাত দুটি জড়িয়ে বললেন-

-নীলাদ্রিবাবু, আপনাকে কে না চেনে?! আপনার মতো গোয়েন্দা যদি তদন্ত করেন, তাহলে আমার স্থির বিশ্বাস আমাদের কূলদেবীকে আমরা ঠিক ফেরত পাবো। আপনিই এখন পারেন আমাদের বংশের মান রক্ষা করতে!

-"সেসব না'হয় ঠিক আছে, এবার গৌরিবাবু, আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব। আপনাকে তার যথাযথ উত্তর দিতে হবে," বললো নীলাদ্রি।

-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়! আপনার যা জিজ্ঞাসু আপনি আমায় জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

-আচ্ছা! সিন্দুকটা কোথায় রাখা থাকে?

-অন্দরমহলে আমার শোওয়ার ঘরে।

-আচ্ছা, আপনাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা কতো? আর আপনার শোওয়ার ঘরে কি সবাই ঢুকতে পারে? আর সিন্দুকই বা কে কে খুলেছিল?

-আমার চারটি সন্তান। আমাদের অন্দরমহলে আমি, আমার স্ত্রী, দুই মেয়ে আর আমার ভাই থাকি। আমার বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, সে শ্বশুরবাড়ি থাকে, আর আমার ছেলে বিদেশেই সেটেলড্। আমার সেক্রেটারি, বৈঠকখানার পাশে যে দুটো ঘর দেখলেন, তার একটায় শুতো আর অপরটায় আমার চাকর, মালি এরা শোয়।

-শুতো কেন বললেন? এখন শোননা?!

-আসলে ওই সিন্দুক আমি ব্যতীত সেই সেক্রেটারি খুলতো। কিন্তু ২ মাস আগে, আমার ব্যবসার হিসেবের খাতায়, বেশ কিছু টাকার হিসাবের গড়মিল দেখা দিলে,  তাঁর কাছে এর কোনো সদুত্তর না থাকায়, আমি তাঁকে কাজ থেকে বহিষ্কার করি। আমার ধারণা সে হয়তো এর প্রতিশোধ.....

-আচ্ছা তাহলে আপনার ব্যবসা এখন কে দেখছে? আর আপনার ভাই কি করেন?

-আমার ভাই হরিপ্রসাদ চৌধুরি। ওর বিষয়-আসয়ে কোনো উৎসাহ নেই। ও দিনরাত নিজের ঘরে ক্যানভাসে ছবি আঁকে। আর এখন আমার ব্যবসা বিদু দেখছে।

-এই বিদু'টা কে?

-বিদু হলো আমার শ্যালক পুত্র, খুব কাজের ছেলে। ওই এখন আমার ব্যবসাটা দেখে। বাপ মা মরা ছেলে, তাই আমার স্ত্রী ওকে নিজের কাছে এনে রেখেছেন। 

-আচ্ছা, বিদুও কি সিন্দুক খোলে?

-হ্যাঁ, কাজের দরকারে আমিই তাঁকে খুলতে বলেছিলাম।

-আই সি! রথের আগে কবে শেষবার সিন্দুক খোলা হয়েছিল?

-আজ্ঞে, রথের আগে বিদুই তো শেষবার সিন্দুক খুলেছিল। আমিই ওঁকে খুলতে বলেছিলাম। আপনি কি কোনোভাবে বিদুকে সন্দেহ.............

-দেখুন, সন্দেহের তালিকায় সবাই আছে। এমনকি আপনিও! আচ্ছা, বিদুর সঙ্গে কি আমি একটু দেখা করতে পারি?

-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়, চলুন আমি আপনাকে ওঁর ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।

-চলুন।


তাঁদের বিদুর ঘরে ঢোকার মুখে, ইন্সপেক্টর সেনের একটি ফোন এলো। ফোনে কথা শেষ করে ইন্সপেক্টর সেন বললেন-" আমায় একটু আর্জেন্ট থানায় যেতে হবে। একটা স্ম্যাগলিং-এর দলের খোঁজ পাওয়া গেছে। উপরমহল থেকে আমায় এই মিশনের দায়িত্ব দিয়েছে। আপনি এইদিকটা সামলান, আমি তাহলে বিদায় নিই"।

-"আচ্ছা" , বললেন নীলাদ্রি। তারপর গৌরিপ্রসাদবাবুকে নিয়ে বিদুর ঘরে ঢুকলেন।


বিদু ঘরে শুয়ে শুয়ে একটি পত্রিকা পড়ছিল, তাঁদের ঘরে ঢুকতে দেখে সে উঠে বসল।


গৌরিপ্রসাদ নীলাদ্রিকে দেখিয়ে, বিদুকে বললেন- " ইনি তোমায় কিছু প্রশ্ন করতে চান।"

নীলাদ্রি বিদুকে জেরা শুরু করল...

-আচ্ছা বিদু, তুমি যখন শেষবার সিন্দুকটা খুলেছিলে তখন মূর্তি টা সিন্দুকে ছিলো?

-আজ্ঞে, তা তো বলতে পারবোনা! সিন্দুকে দুটো সারি আছে, একটায় মূর্তি থাকতো আর একটায় ব্যবসার টাকা! দুটোরই আলাদা লক্ । আমি তো কেবল নীচের খোপটা খুলে টাকা বের করেছিলাম, তাই আমি ঠিক বলতে পারবোনা মূর্তির ব্যাপারে!

-আই সি! তা তুমি এখানে কতদিন আছো?

-তা প্রায় দেড় মাস হলো, পিসি আমায় নিজের কাছে এনে রেখেছেন।

-এর আগে তুমি কি করতে আর কোথায় থাকতে?

-আমি মধ্যপ্রদেশের একটি কলেজে থেকে পড়াশোনা করেছিলাম। তার আগে বাবা মার সঙ্গে কলকাতার তারাতলায় থাকতাম। বাবা মা দুজনেই পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন। আমিও বেশ জখম হয়েছিলাম, কিন্তু সেসব কাটিয়ে আমি মধ্যপ্রদেশে চলে যাই এবং ওখানকার একটা কলেজে ভর্তি হই।

-আচ্ছা। এখন থাক! দরকার পড়লে আবার তোমায় জিজ্ঞাসাবাদ করবো।

এই বলে নীলাদ্রি, গৌরিপ্রসাদবাবুকে সিন্দুকটা  দেখাতে বললেন।

গৌরিপ্রসাদ নীলাদ্রিকে অন্দরমহলে নিয়ে এসে তার শোওয়ার ঘরে নিয়ে চললেন সিন্দুক দেখাতে....


নীলাদ্রি গৌরিপ্রসাদের শয়নকক্ষে ঢুকে দেখলেন, বিদেশি দামী দামী আসবাবপত্রে ঘরটি সুসজ্জিত। একটা হাত ছয়েক উচ্চতার দামী বেলজিয়াম কাঠের উপর অতি নিখুঁত কারুকার্য করা একটি সিন্দুক। নীলাদ্রি সিন্দুকটাকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর গৌরিপ্রসাদবাবুকে বলল, সে বাড়ির সকলকেই জেরা করতে চায় একে একে। গৌরিপ্রসাদ, বাড়ির সকলকে নীলাদ্রির কাছে পাঠিয়ে দিলেন একে একে।


নীলাদ্রি সকলকেই পা থেকে মাথা অবধি দেখল এবং সকলকেই মোটামুটি যৎসামান্য কিছু প্রশ্ন করল।  যেমন- তাঁরা কি করে? মূর্তিটি নিরূদ্দেশের পিছনে কার হাত আছে বলে মনে হয়.....এইরকম টুকটাক প্রশ্নের উত্তরে, নীলাদ্রি সবার থেকেই জানালো, তাঁদের সন্দেহের তির প্রাক্তন সেক্রেটারির উপরই বিঁধছে।


সবাইকে জেরার পর, নীলাদ্রি একটু চৌধুরি বাড়ির বাগানে এবং আশেপাশের জায়গায় ঘুরে এসে যখন চৌধুরি বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে বছর ৩৬-এর একটি যুবকের ধাক্কা লাগে! যুবকটি অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে, করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে বাড়ি চলে যান।

ততক্ষণে গৌরিপ্রসাদ বাবু সেখানে উপস্থিত হয়েছেন, তিনিও নীলাদ্রির কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁকে বৈঠকখানায় নিয়ে আসেন। নীলাদ্রির বাইরের যুবকটির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান, ওই যুবকটি তাঁর বড়োজামাই। মূর্তি নিরূদ্দেশ আবিষ্কারের সময় সে ব্যবসা সূত্রে বাইরে ছিলো। আজ ফিরে এসে সবকথা জানতে পেরে তাই দেখা করতে ও সান্ত্বনা দিতে এসেছিল। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় নীলাদ্রি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

বাড়ি পৌছে ইন্সপেক্টর সেনকে ফোন করে, অনেকক্ষণ ধরে তাঁর সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা বলে, রাতের খাবার খেয়ে সে শুতে চলে গেল।

সকালে প্রাতঃভ্রমণ সেরে এসে, প্রহ্লাদকে চা করতে বলে, চৌধুরি বাড়িতে ফোন করলেন। গৌরিপ্রসাদ চৌধুরিই ফোন ধরেছিলেন। নীলাদ্রি তাঁকে জানালেন যে সে কেস্ টা সলভ্ করে ফেলেছে। একঘন্টার মধ্যেই সে ইন্সপেক্টর সেনকে নিয়ে চৌধুরি বাড়িতে পৌছাবে এবং তাঁর হাতে দেবী চন্ডীকার মূর্তি তুলে দেবে। কিন্তু, নীলাদ্রি সবার সমুক্ষেই মূর্তিটি তুলে দিতে চায়, তাই সেইসময় যেন তাদের বাড়ির সবাই উপস্থিত থাকে,  এমনকি তাঁর বড়ো মেয়ে ও জামাইও যেন উপস্থিত থাকে। গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি রাজি হয়ে গেলেন।

************************

ঘড়িতে সকাল ১০:৪৫ বাজে, এতক্ষণ চৌধুরি বাড়ির উপর দিয়ে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। পুলিশ অপরাধীকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে।


নীলাদ্রি, তাঁর কথামতো সকাল ১০ টায় চৌধুরি বাড়িতে হাজির হয় ইন্সপেক্টর সেনকে নিয়ে।  ঢুকে দেখলেন, পরিবারের সবাই মোটামুটি উপস্থিত আছে। ইন্সপেক্টর সেন এরপর মূর্তিটি গৌরিপ্রসাদ চৌধুরির হাতে তুলে দিলেন। গৌরিপ্রসাদবাবু, নীলাদ্রিকে জিজ্ঞেস করলেন সে কোথায় পেল এই মূর্তি?!

নীলাদ্রি, গৌরিপ্রসাদকে বললেন, " এই উত্তর আমার থেকে, আপনার জামাই ভালো দিতে পারবে!"

চৌধুরি বাড়ির সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। নীলাদ্রি চৌধুরি বাড়ির বড়োজামাই-এর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাঁকে বললেন, " কি! আপনার খেলার তো আমি যবনিকা টেনে দিলাম।"

বড়োজামাই রাগে তড়পাতে লাগল এবং হিসহিসে গলায় বলল -

-কি যাতাহ্ বলছেন আপনি? আপনার বিরুদ্ধে আমি মানহানির মামলা করবো।


নীলাদ্রি তখন বললো-

-আপনি তো দেখছি ভাঙবেন তবু মচকাবেননা! আচ্ছা তাহলে আমিই সব বলি। চৌধুরি মশাই, আপনারা কেউই খেয়াল করেননি যে, যেই খোপে আপনারা মূর্তি রাখতেন, তাতে হালকা আঁচড়ের দাগ আছে! আপনার জামাই সিন্দুক খুলে মূর্তিটা দেখতে পায়! তখন সে যেন, না চাইতেই হাতে আকাশের চাঁদ পায় কারণ এর আগেও সে আপনাদের মূর্তি টি দেখেছিল এবং আপনার বড়োমেয়ের কাছে ওই মূর্তির ইতিহাস শুনে, তাঁর ওই মূর্তির প্রতি লোভ জন্মায়। আপনার জামাই আগে অ্যান্টিক চোরামাল চালাইয়ের দলে যুক্ত ছিল, সেই দল ধরা পড়লেও আপনার বড়োজামাই সেইযাত্রায় পালিয়ে বাঁচে। এরপর কলকাতায় এসে, সে একটি কাপড়ের দোকান খোলে এবং তলে তলে একটি স্ম্যাগলিং-এর দল তৈরি করে। কথায় আছে, ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে। তাঁর জহুরির চোখ, মূর্তি দেখে সে বুঝতে পারে এর বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১২ লক্ষ কোটি টাকা। এই জিনিস তাঁর হেফাজতে এলে সে বাকি জীবন রাজার হালে কাটিয়ে দিতে পারবে। যাইহোক, এবার কাজের কথায় আসি, আপনার বড়োজামাই যখন আমার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে করজোড়ে নমস্কার করলো, তখন আমি দেখলাম তার ডানহাতের আঙটির একটা কোণ  সূঁচালো। মূর্তি চুরি করার সময় তাড়াহুড়ো করায় ওই অংশ দিয়ে, সিন্দুকে ওই আঁচড়ের দাগের সৃষ্টি হয়েছে।

গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি বলে উঠলেন, " হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আমার সেক্রেটারি চলে যাওয়ার পর পরই একদিন সকালে, আমি আমার ব্যবসার স্থানে অসুস্থ হয়ে পড়ি! কিন্তু ওইসময়ই আমার এক মহাজন ৫০ হাজার টাকা চাইতে এলে, আমি আমার বড়োজামাইকে সিন্দুকের চাবিগুচ্ছো দিয়ে তাঁকে সেই টাকা মিটিয়ে দিতে বলি কারণ সেও ব্যবসার সূত্রে ওই মহাজনকে চিনতো। তারপর সে বিকেলে এসে চাবিগুচ্ছো আমায় ফিরিয়ে দেয়।"

নীলাদ্রি তখন বলে উঠল-

-হ্যাঁ, সেইদিনই সে মূর্তি চুরি করে কিন্তু তাড়া থাকায় সে ওই মূর্তিটা আপনারই বাগানের এককোণে, যেখানে ঝোপজঙ্গল, সেখানে মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রাখে। উনি যে সেদিন আপনার মহাজনকে টাকা মেটানোর তাড়ায় ছিলেন তা নয়। সেদিন ওর দলের স্ম্যাগলারদের সঙ্গে অন্য দলের স্ম্যাগলারদের একটা বড়ো ডিল্ ছিলো। তাই ও অন্যমনস্ক ছিলেন এবং তাড়াহুড়ো করে মূর্তিটিকে মাটি চাপা দেওয়ার সময় তাঁর পকেট থেকে অনেকটা মাদক ওইস্থানে পড়ে যায়! আর কাল যখন আমি আপনাদের বাগানে ঘুরতে আসি, ঝোপজঙ্গলের ওখানে ওতো পিঁপড়ের সারি দেখে আমার সন্দেহ হয় এবং একটু অনুসন্ধান করতেই যা ফল পেলাম তা আপনাদের সামনে!

এতক্ষণে চৌধুরি বাড়ির বড়োজামাই পালানোর চেষ্টা করেন।

সঙ্গে সঙ্গে ইন্সপেক্টর সেন রিভলবার বের করে বলেন, " আপনার পালাতে চাওয়া বৃথা! এই বাড়ির গোটা চত্বর আমাদের র্ফোস ঘিরে রেখেছে, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট!"

পুলিশ বড়োজামাই কে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়ার পর গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি, নীলাদ্রিকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি মূর্তিটা কখন তুললেন? কাল তো আপনি খালি হাতেই চলে গেলেন!"

ইন্সপেক্টর সেনই বলে উঠলেন-

-কাল নীলাদ্রিবাবু বাড়ি পৌছে আমায় সব জানান এবং বলেন তক্ষুনি যেন কোনো পুলিশ কর্মী গিয়ে মূর্তিটা তুলে নিয়ে আসে, নইলে কাল রাতেই হয়তো আপনার বড়োজামাই ওই মূর্তি সরিয়ে ফেলতে পারে এবং বাইরে কোথাও পালিয়ে যেতে পারে কারণ সে বুঝে গেছিল, গোয়েন্দা নীলাদ্রি এই কেস্ টা নিয়েছে, এবার কেঁচো খুঁড়তে হয়তো কেউটে বেরিয়ে পড়বে! আমরাও তাই নীলাদ্রিবাবুর কথামতো,  পিছনের পাঁচিল দিয়ে আপনাদের বাগানের ঢুকে, মূর্তিটি পুলিশ হেফাজতে রাখি এবং আজ আপনার হাতে তুলে দিই। সম্পূর্ণ ক্রেডিট কিন্তু নিলাদ্রিবাবুরই প্রাপ্য। উনি ছাড়া কিছুই সম্ভব হোতোনা আর আমরাও হয়তো স্ম্যাগলিং দলটাকে খুঁজে পেতামনা!


নীলাদ্রি এবার একটু লজ্জা পেয়ে গৌরিপ্রসাদবাবু ও ইন্সপেক্টর সেনের কাছে বিদায় চাইলেন।


গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি তখন ৩০হাজার টাকা এনে নীলাদ্রিকে দিয়ে বললেন, "আপনি দয়া করে এটা রাখুন নীলাদ্রিবাবু! আমার বংশের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য এ অত্যন্ত ছোট্ট সম্মান!"

নীলাদ্রি সেই টাকা নিতে না চাইলেও তিনি জোর করে তাকে তা দিলেন এবং তাঁদের মধ্যাহ্নভোজ না করিয়ে ছাড়লেননা। ইন্সপেক্টর সেন ও নীলাদ্রির বিদায়কালে, গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি বারবার তাঁদের দূর্গা পুজোয় আসার আমন্ত্রণ করলেন। তাঁরাও সম্মতি জানিয়ে বিদায় নিলো।

তাঁদের বিদায়কালে, সূর্য দিগন্তরেখার নীচে ঢলে পড়েছে, গোধূলির মিঠে নরম আলোয় চারিদিকে এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা....

গাড়িতে উঠেই নীলাদ্রি গান শুরু করল-

"ইয়ে শাম্ মস্তানি/ মাদহোস্ হুয়ে যায়....


মধুশ্রী মজুমদার  ©

মনে পড়ে যায় সেই হৃদয় দেবার তিথি দুজনার দুটি পথ মিশে গেল এক হয়ে নতুন পথের বাঁকে।

 মনে পড়ে যায় সেই মন দেওয়ার তিথি, আজও মনে আছে সব, ভুলতে পারিনি অনেক সময় গেছে বিতি । সেদিন ছিলো পূর্ণিমা রাত যেনো জ্যোৎস্না স্নাত প্ৰহেলিক...