Tuesday, 2 March 2021

চৌধুরি বাড়ির মূর্তি রহস্য

সকালবেলায় প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরে এসে নীলাদ্রি চা পান করছিল নিজের ঘরে। হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠায় , সে চাকর প্রহ্লাদকে বলল দরজা খুলতে। চাকর এসে জানাল-

-দাদাবাবু, ইন্সপেক্টর সেন এসেছেন, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।

নীলাদ্রি ইন্সপেক্টর সেনকে উপরের ঘরে পাঠিয়ে দিতে বললেন এবং আরেক পেয়ালা চা দিতে বললেন। ইন্সপেক্টর তাঁর ঘরে ঢুকলে, নীলাদ্রি তাঁকে চেয়ারে বসতে বলে সাতসকালে তাঁর আগমনের হেতু জানতে চাইলেন। ততক্ষণে প্রহ্লাদ এসে দুজনের জন্য চা দিয়ে গেছে। নীলাদ্রির এই একটাই নেশা হলো মাত্রাতিরিক্ত চা পান! তাই নীলাদ্রি এককাপ বললেও প্রহ্লাদ দু'পেয়ালা চা নিয়ে এলো।

চা শেষ করে ইন্সপেক্টর সেন বললেন-

-আর বলবেন না মশাই, ভালো জ্বালায় ফেঁসে আপনার শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছি। কলকাতার চৌধুরি বাড়ির নাম তো শুনেছেন, কলকাতার বনেদি বাড়িগুলির অন্যতম বাড়ি। তা হয়েছে কি, ২৫০ বছর আগে, চৌধুরি বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীঁ গৌরাঙ্গনাথ চৌধুরি পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় বাণিজ্য করতে এসে, কলকাতায় চৌধুরিদের  বর্তমান গৃহটি নির্মাণ করেন এবং পরবর্তীকালে পরিবারকে এখানে নিয়ে এসে বসবাস শুরু করেন। আসার সময় তাঁদের স্বর্ণনির্মিত কূলদেবী চন্ডীকার মূর্তিটি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে প্রতিবছর দূর্গাপুজোয় মহামায়ার সঙ্গে চন্ডীকা দেবীও পূজিতা হন। রথে কাঠামো পুজোর দিন, চন্ডীকা দেবীকে সিন্দুক থেকে বের করা হয়।

এইবছর রথের দিন সিন্দুক খুললে, সিন্দুক খালি অবস্থায় মেলে! এরপর চৌধুরি বাড়ির বর্তমান কত্তা গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি লালবাজারে যোগাযোগ করেন। কিন্তু, গোয়েন্দা বিভাগের কেউই কেস্ টা সলভ্ করতে পারছেনা, অগত্যা তাই আপনার কাছে আসা। আপনি যদি কেস্ টা নেন!?

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর ইন্সপেক্টর সেনকে জানাল- "আমি চৌধুরি বাড়িতে যেতে চাই।"

তক্ষুনি ইন্সপেক্টর এবং নীলাদ্রি চৌধুরি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল...

চৌধুরি বাড়িতে এসে নীলাদ্রি দেখল বাড়িটি দো'মহলা। বৈঠকখানায় তাঁদের বসিয়ে, বাড়ির চাকর গৌরিপ্রসাদ চৌধুরিকে ডাকতে গেলেন। গৌরিপ্রসাদ এলে, ইন্সপেক্টর সেন তাঁর সঙ্গে নীলাদ্রির পরিচয় করিয়ে দিল।

নীলাদ্রি দেখল গৌরিপ্রসাদ চৌধুরির বয়স ষাটোর্ধ্ব হলেও চেহারায় বনেদি ছাপ! কিন্তু তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মূর্তি নিরূদ্দেশের চিন্তায় তিনি কয়েক রাত বিনিদ্র কাটিয়েছেন।

চৌধুরি মশাই নীলাদ্রিকে দেখে, তাঁর হাত দুটি জড়িয়ে বললেন-

-নীলাদ্রিবাবু, আপনাকে কে না চেনে?! আপনার মতো গোয়েন্দা যদি তদন্ত করেন, তাহলে আমার স্থির বিশ্বাস আমাদের কূলদেবীকে আমরা ঠিক ফেরত পাবো। আপনিই এখন পারেন আমাদের বংশের মান রক্ষা করতে!

-"সেসব না'হয় ঠিক আছে, এবার গৌরিবাবু, আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব। আপনাকে তার যথাযথ উত্তর দিতে হবে," বললো নীলাদ্রি।

-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়! আপনার যা জিজ্ঞাসু আপনি আমায় জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

-আচ্ছা! সিন্দুকটা কোথায় রাখা থাকে?

-অন্দরমহলে আমার শোওয়ার ঘরে।

-আচ্ছা, আপনাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা কতো? আর আপনার শোওয়ার ঘরে কি সবাই ঢুকতে পারে? আর সিন্দুকই বা কে কে খুলেছিল?

-আমার চারটি সন্তান। আমাদের অন্দরমহলে আমি, আমার স্ত্রী, দুই মেয়ে আর আমার ভাই থাকি। আমার বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, সে শ্বশুরবাড়ি থাকে, আর আমার ছেলে বিদেশেই সেটেলড্। আমার সেক্রেটারি, বৈঠকখানার পাশে যে দুটো ঘর দেখলেন, তার একটায় শুতো আর অপরটায় আমার চাকর, মালি এরা শোয়।

-শুতো কেন বললেন? এখন শোননা?!

-আসলে ওই সিন্দুক আমি ব্যতীত সেই সেক্রেটারি খুলতো। কিন্তু ২ মাস আগে, আমার ব্যবসার হিসেবের খাতায়, বেশ কিছু টাকার হিসাবের গড়মিল দেখা দিলে,  তাঁর কাছে এর কোনো সদুত্তর না থাকায়, আমি তাঁকে কাজ থেকে বহিষ্কার করি। আমার ধারণা সে হয়তো এর প্রতিশোধ.....

-আচ্ছা তাহলে আপনার ব্যবসা এখন কে দেখছে? আর আপনার ভাই কি করেন?

-আমার ভাই হরিপ্রসাদ চৌধুরি। ওর বিষয়-আসয়ে কোনো উৎসাহ নেই। ও দিনরাত নিজের ঘরে ক্যানভাসে ছবি আঁকে। আর এখন আমার ব্যবসা বিদু দেখছে।

-এই বিদু'টা কে?

-বিদু হলো আমার শ্যালক পুত্র, খুব কাজের ছেলে। ওই এখন আমার ব্যবসাটা দেখে। বাপ মা মরা ছেলে, তাই আমার স্ত্রী ওকে নিজের কাছে এনে রেখেছেন। 

-আচ্ছা, বিদুও কি সিন্দুক খোলে?

-হ্যাঁ, কাজের দরকারে আমিই তাঁকে খুলতে বলেছিলাম।

-আই সি! রথের আগে কবে শেষবার সিন্দুক খোলা হয়েছিল?

-আজ্ঞে, রথের আগে বিদুই তো শেষবার সিন্দুক খুলেছিল। আমিই ওঁকে খুলতে বলেছিলাম। আপনি কি কোনোভাবে বিদুকে সন্দেহ.............

-দেখুন, সন্দেহের তালিকায় সবাই আছে। এমনকি আপনিও! আচ্ছা, বিদুর সঙ্গে কি আমি একটু দেখা করতে পারি?

-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়, চলুন আমি আপনাকে ওঁর ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।

-চলুন।


তাঁদের বিদুর ঘরে ঢোকার মুখে, ইন্সপেক্টর সেনের একটি ফোন এলো। ফোনে কথা শেষ করে ইন্সপেক্টর সেন বললেন-" আমায় একটু আর্জেন্ট থানায় যেতে হবে। একটা স্ম্যাগলিং-এর দলের খোঁজ পাওয়া গেছে। উপরমহল থেকে আমায় এই মিশনের দায়িত্ব দিয়েছে। আপনি এইদিকটা সামলান, আমি তাহলে বিদায় নিই"।

-"আচ্ছা" , বললেন নীলাদ্রি। তারপর গৌরিপ্রসাদবাবুকে নিয়ে বিদুর ঘরে ঢুকলেন।


বিদু ঘরে শুয়ে শুয়ে একটি পত্রিকা পড়ছিল, তাঁদের ঘরে ঢুকতে দেখে সে উঠে বসল।


গৌরিপ্রসাদ নীলাদ্রিকে দেখিয়ে, বিদুকে বললেন- " ইনি তোমায় কিছু প্রশ্ন করতে চান।"

নীলাদ্রি বিদুকে জেরা শুরু করল...

-আচ্ছা বিদু, তুমি যখন শেষবার সিন্দুকটা খুলেছিলে তখন মূর্তি টা সিন্দুকে ছিলো?

-আজ্ঞে, তা তো বলতে পারবোনা! সিন্দুকে দুটো সারি আছে, একটায় মূর্তি থাকতো আর একটায় ব্যবসার টাকা! দুটোরই আলাদা লক্ । আমি তো কেবল নীচের খোপটা খুলে টাকা বের করেছিলাম, তাই আমি ঠিক বলতে পারবোনা মূর্তির ব্যাপারে!

-আই সি! তা তুমি এখানে কতদিন আছো?

-তা প্রায় দেড় মাস হলো, পিসি আমায় নিজের কাছে এনে রেখেছেন।

-এর আগে তুমি কি করতে আর কোথায় থাকতে?

-আমি মধ্যপ্রদেশের একটি কলেজে থেকে পড়াশোনা করেছিলাম। তার আগে বাবা মার সঙ্গে কলকাতার তারাতলায় থাকতাম। বাবা মা দুজনেই পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন। আমিও বেশ জখম হয়েছিলাম, কিন্তু সেসব কাটিয়ে আমি মধ্যপ্রদেশে চলে যাই এবং ওখানকার একটা কলেজে ভর্তি হই।

-আচ্ছা। এখন থাক! দরকার পড়লে আবার তোমায় জিজ্ঞাসাবাদ করবো।

এই বলে নীলাদ্রি, গৌরিপ্রসাদবাবুকে সিন্দুকটা  দেখাতে বললেন।

গৌরিপ্রসাদ নীলাদ্রিকে অন্দরমহলে নিয়ে এসে তার শোওয়ার ঘরে নিয়ে চললেন সিন্দুক দেখাতে....


নীলাদ্রি গৌরিপ্রসাদের শয়নকক্ষে ঢুকে দেখলেন, বিদেশি দামী দামী আসবাবপত্রে ঘরটি সুসজ্জিত। একটা হাত ছয়েক উচ্চতার দামী বেলজিয়াম কাঠের উপর অতি নিখুঁত কারুকার্য করা একটি সিন্দুক। নীলাদ্রি সিন্দুকটাকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর গৌরিপ্রসাদবাবুকে বলল, সে বাড়ির সকলকেই জেরা করতে চায় একে একে। গৌরিপ্রসাদ, বাড়ির সকলকে নীলাদ্রির কাছে পাঠিয়ে দিলেন একে একে।


নীলাদ্রি সকলকেই পা থেকে মাথা অবধি দেখল এবং সকলকেই মোটামুটি যৎসামান্য কিছু প্রশ্ন করল।  যেমন- তাঁরা কি করে? মূর্তিটি নিরূদ্দেশের পিছনে কার হাত আছে বলে মনে হয়.....এইরকম টুকটাক প্রশ্নের উত্তরে, নীলাদ্রি সবার থেকেই জানালো, তাঁদের সন্দেহের তির প্রাক্তন সেক্রেটারির উপরই বিঁধছে।


সবাইকে জেরার পর, নীলাদ্রি একটু চৌধুরি বাড়ির বাগানে এবং আশেপাশের জায়গায় ঘুরে এসে যখন চৌধুরি বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে বছর ৩৬-এর একটি যুবকের ধাক্কা লাগে! যুবকটি অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে, করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে বাড়ি চলে যান।

ততক্ষণে গৌরিপ্রসাদ বাবু সেখানে উপস্থিত হয়েছেন, তিনিও নীলাদ্রির কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁকে বৈঠকখানায় নিয়ে আসেন। নীলাদ্রির বাইরের যুবকটির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান, ওই যুবকটি তাঁর বড়োজামাই। মূর্তি নিরূদ্দেশ আবিষ্কারের সময় সে ব্যবসা সূত্রে বাইরে ছিলো। আজ ফিরে এসে সবকথা জানতে পেরে তাই দেখা করতে ও সান্ত্বনা দিতে এসেছিল। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় নীলাদ্রি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

বাড়ি পৌছে ইন্সপেক্টর সেনকে ফোন করে, অনেকক্ষণ ধরে তাঁর সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা বলে, রাতের খাবার খেয়ে সে শুতে চলে গেল।

সকালে প্রাতঃভ্রমণ সেরে এসে, প্রহ্লাদকে চা করতে বলে, চৌধুরি বাড়িতে ফোন করলেন। গৌরিপ্রসাদ চৌধুরিই ফোন ধরেছিলেন। নীলাদ্রি তাঁকে জানালেন যে সে কেস্ টা সলভ্ করে ফেলেছে। একঘন্টার মধ্যেই সে ইন্সপেক্টর সেনকে নিয়ে চৌধুরি বাড়িতে পৌছাবে এবং তাঁর হাতে দেবী চন্ডীকার মূর্তি তুলে দেবে। কিন্তু, নীলাদ্রি সবার সমুক্ষেই মূর্তিটি তুলে দিতে চায়, তাই সেইসময় যেন তাদের বাড়ির সবাই উপস্থিত থাকে,  এমনকি তাঁর বড়ো মেয়ে ও জামাইও যেন উপস্থিত থাকে। গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি রাজি হয়ে গেলেন।

************************

ঘড়িতে সকাল ১০:৪৫ বাজে, এতক্ষণ চৌধুরি বাড়ির উপর দিয়ে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। পুলিশ অপরাধীকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে।


নীলাদ্রি, তাঁর কথামতো সকাল ১০ টায় চৌধুরি বাড়িতে হাজির হয় ইন্সপেক্টর সেনকে নিয়ে।  ঢুকে দেখলেন, পরিবারের সবাই মোটামুটি উপস্থিত আছে। ইন্সপেক্টর সেন এরপর মূর্তিটি গৌরিপ্রসাদ চৌধুরির হাতে তুলে দিলেন। গৌরিপ্রসাদবাবু, নীলাদ্রিকে জিজ্ঞেস করলেন সে কোথায় পেল এই মূর্তি?!

নীলাদ্রি, গৌরিপ্রসাদকে বললেন, " এই উত্তর আমার থেকে, আপনার জামাই ভালো দিতে পারবে!"

চৌধুরি বাড়ির সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। নীলাদ্রি চৌধুরি বাড়ির বড়োজামাই-এর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাঁকে বললেন, " কি! আপনার খেলার তো আমি যবনিকা টেনে দিলাম।"

বড়োজামাই রাগে তড়পাতে লাগল এবং হিসহিসে গলায় বলল -

-কি যাতাহ্ বলছেন আপনি? আপনার বিরুদ্ধে আমি মানহানির মামলা করবো।


নীলাদ্রি তখন বললো-

-আপনি তো দেখছি ভাঙবেন তবু মচকাবেননা! আচ্ছা তাহলে আমিই সব বলি। চৌধুরি মশাই, আপনারা কেউই খেয়াল করেননি যে, যেই খোপে আপনারা মূর্তি রাখতেন, তাতে হালকা আঁচড়ের দাগ আছে! আপনার জামাই সিন্দুক খুলে মূর্তিটা দেখতে পায়! তখন সে যেন, না চাইতেই হাতে আকাশের চাঁদ পায় কারণ এর আগেও সে আপনাদের মূর্তি টি দেখেছিল এবং আপনার বড়োমেয়ের কাছে ওই মূর্তির ইতিহাস শুনে, তাঁর ওই মূর্তির প্রতি লোভ জন্মায়। আপনার জামাই আগে অ্যান্টিক চোরামাল চালাইয়ের দলে যুক্ত ছিল, সেই দল ধরা পড়লেও আপনার বড়োজামাই সেইযাত্রায় পালিয়ে বাঁচে। এরপর কলকাতায় এসে, সে একটি কাপড়ের দোকান খোলে এবং তলে তলে একটি স্ম্যাগলিং-এর দল তৈরি করে। কথায় আছে, ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে। তাঁর জহুরির চোখ, মূর্তি দেখে সে বুঝতে পারে এর বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১২ লক্ষ কোটি টাকা। এই জিনিস তাঁর হেফাজতে এলে সে বাকি জীবন রাজার হালে কাটিয়ে দিতে পারবে। যাইহোক, এবার কাজের কথায় আসি, আপনার বড়োজামাই যখন আমার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে করজোড়ে নমস্কার করলো, তখন আমি দেখলাম তার ডানহাতের আঙটির একটা কোণ  সূঁচালো। মূর্তি চুরি করার সময় তাড়াহুড়ো করায় ওই অংশ দিয়ে, সিন্দুকে ওই আঁচড়ের দাগের সৃষ্টি হয়েছে।

গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি বলে উঠলেন, " হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আমার সেক্রেটারি চলে যাওয়ার পর পরই একদিন সকালে, আমি আমার ব্যবসার স্থানে অসুস্থ হয়ে পড়ি! কিন্তু ওইসময়ই আমার এক মহাজন ৫০ হাজার টাকা চাইতে এলে, আমি আমার বড়োজামাইকে সিন্দুকের চাবিগুচ্ছো দিয়ে তাঁকে সেই টাকা মিটিয়ে দিতে বলি কারণ সেও ব্যবসার সূত্রে ওই মহাজনকে চিনতো। তারপর সে বিকেলে এসে চাবিগুচ্ছো আমায় ফিরিয়ে দেয়।"

নীলাদ্রি তখন বলে উঠল-

-হ্যাঁ, সেইদিনই সে মূর্তি চুরি করে কিন্তু তাড়া থাকায় সে ওই মূর্তিটা আপনারই বাগানের এককোণে, যেখানে ঝোপজঙ্গল, সেখানে মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রাখে। উনি যে সেদিন আপনার মহাজনকে টাকা মেটানোর তাড়ায় ছিলেন তা নয়। সেদিন ওর দলের স্ম্যাগলারদের সঙ্গে অন্য দলের স্ম্যাগলারদের একটা বড়ো ডিল্ ছিলো। তাই ও অন্যমনস্ক ছিলেন এবং তাড়াহুড়ো করে মূর্তিটিকে মাটি চাপা দেওয়ার সময় তাঁর পকেট থেকে অনেকটা মাদক ওইস্থানে পড়ে যায়! আর কাল যখন আমি আপনাদের বাগানে ঘুরতে আসি, ঝোপজঙ্গলের ওখানে ওতো পিঁপড়ের সারি দেখে আমার সন্দেহ হয় এবং একটু অনুসন্ধান করতেই যা ফল পেলাম তা আপনাদের সামনে!

এতক্ষণে চৌধুরি বাড়ির বড়োজামাই পালানোর চেষ্টা করেন।

সঙ্গে সঙ্গে ইন্সপেক্টর সেন রিভলবার বের করে বলেন, " আপনার পালাতে চাওয়া বৃথা! এই বাড়ির গোটা চত্বর আমাদের র্ফোস ঘিরে রেখেছে, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট!"

পুলিশ বড়োজামাই কে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়ার পর গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি, নীলাদ্রিকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি মূর্তিটা কখন তুললেন? কাল তো আপনি খালি হাতেই চলে গেলেন!"

ইন্সপেক্টর সেনই বলে উঠলেন-

-কাল নীলাদ্রিবাবু বাড়ি পৌছে আমায় সব জানান এবং বলেন তক্ষুনি যেন কোনো পুলিশ কর্মী গিয়ে মূর্তিটা তুলে নিয়ে আসে, নইলে কাল রাতেই হয়তো আপনার বড়োজামাই ওই মূর্তি সরিয়ে ফেলতে পারে এবং বাইরে কোথাও পালিয়ে যেতে পারে কারণ সে বুঝে গেছিল, গোয়েন্দা নীলাদ্রি এই কেস্ টা নিয়েছে, এবার কেঁচো খুঁড়তে হয়তো কেউটে বেরিয়ে পড়বে! আমরাও তাই নীলাদ্রিবাবুর কথামতো,  পিছনের পাঁচিল দিয়ে আপনাদের বাগানের ঢুকে, মূর্তিটি পুলিশ হেফাজতে রাখি এবং আজ আপনার হাতে তুলে দিই। সম্পূর্ণ ক্রেডিট কিন্তু নিলাদ্রিবাবুরই প্রাপ্য। উনি ছাড়া কিছুই সম্ভব হোতোনা আর আমরাও হয়তো স্ম্যাগলিং দলটাকে খুঁজে পেতামনা!


নীলাদ্রি এবার একটু লজ্জা পেয়ে গৌরিপ্রসাদবাবু ও ইন্সপেক্টর সেনের কাছে বিদায় চাইলেন।


গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি তখন ৩০হাজার টাকা এনে নীলাদ্রিকে দিয়ে বললেন, "আপনি দয়া করে এটা রাখুন নীলাদ্রিবাবু! আমার বংশের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য এ অত্যন্ত ছোট্ট সম্মান!"

নীলাদ্রি সেই টাকা নিতে না চাইলেও তিনি জোর করে তাকে তা দিলেন এবং তাঁদের মধ্যাহ্নভোজ না করিয়ে ছাড়লেননা। ইন্সপেক্টর সেন ও নীলাদ্রির বিদায়কালে, গৌরিপ্রসাদ চৌধুরি বারবার তাঁদের দূর্গা পুজোয় আসার আমন্ত্রণ করলেন। তাঁরাও সম্মতি জানিয়ে বিদায় নিলো।

তাঁদের বিদায়কালে, সূর্য দিগন্তরেখার নীচে ঢলে পড়েছে, গোধূলির মিঠে নরম আলোয় চারিদিকে এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা....

গাড়িতে উঠেই নীলাদ্রি গান শুরু করল-

"ইয়ে শাম্ মস্তানি/ মাদহোস্ হুয়ে যায়....


মধুশ্রী মজুমদার  ©

No comments:

Post a Comment

মনে পড়ে যায় সেই হৃদয় দেবার তিথি দুজনার দুটি পথ মিশে গেল এক হয়ে নতুন পথের বাঁকে।

 মনে পড়ে যায় সেই মন দেওয়ার তিথি, আজও মনে আছে সব, ভুলতে পারিনি অনেক সময় গেছে বিতি । সেদিন ছিলো পূর্ণিমা রাত যেনো জ্যোৎস্না স্নাত প্ৰহেলিক...