নমস্কার, বসুধা প্রকাশনী তে আপনাদের সকলকে বর্ণমালার মাধ্যমে স্বাগত । নবাগত ও নবাগতা কলমের কালির অক্ষর দিয়ে সাজানো আমাদের এই যান্ত্রিক মাধ্যম ।
Saturday, 27 February 2021
উনিশটা বসন্ত পেরিয়ে
আজ আরও একপদক্ষেপ মৃত্যুর পথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে।দেখতে দেখতে ঊনিশটা বসন্ত পার করেই ফেললাম,কাল আরও এক নতুন বসন্তের অপেক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।জীবনের পথ যেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে না যায়,সেই পথ যেন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হতে থাকে।কারণ এখনও আমি অনেক কিছু জানতে চাই, শিখতে চাই,আরও অনেক মানুষের সান্নিধ্য লাভ করতে চাই, ভালো মানুষ হতে চাই,অনেকের কাছ থেকে ভালোবাসা পেতে চাই।সব আশা পূরণ না করে মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই না।ঊনিশটা বসন্ত পার হলেও জীবনে এখনও বসন্তকে প্রবেশ করতে দিইনি। অনেকবার অনেক বসন্ত এসে দরজায় কড়া নেড়ে গেছে, কিন্তু কোনো বসন্তের ডাকে দরজা খুলতে চাইনি।কেননা,এগুলো সজীবতা ভরিয়ে দিতে পারতনা!সবই গ্রীষ্মের কঠোর উষ্ণতা দিয়ে খরা বানিয়ে চলে যেত আমার জীবনকে।ভালো হয়েছে ফিরে গেছে প্রায় সব বসন্তই।শুধু একটা বসন্ত এখনও মাঝে মাঝে দরজায় কড়া নেড়ে যায়।সেটা সজীবতা বা খরা কোনোটাই করেনি,বর্ষার কালোমেঘ সৃষ্টি করে মাঝে মাঝে।কুড়ি তম বসন্তে তারও ফিরে যাওয়াই সমীচীন হবে। কারণ আমার মনের অন্দরে সহজে প্রবেশ করার ক্ষমতা তারও নেই।অচেনা অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, হারিয়েছিও অনেক কিছু এই দশকে।কাল নতুন দশক শুরু হতে চলেছে।তবুও মা-বাবার কাছে সেই ছোট মেয়ে হয়েই থাকতে চাই।কারণ বয়সটা শুধু সংখ্যামাত্র।ভালোবাসার অঙ্কের সমাধান করার সূত্র ভাগ্যিস এখনও বের হয়নি।তাহলে হিসেব ভুল করতাম বারবার।জীবনের ঊনিশ তম বয়সের শেষ দিনে সবার কাছে প্রার্থনা করি-
"বসন্ত আসুক বা নাই আসুক,আমৃত্যু সবাই আমাকে চিরকাল
এভাবেই ভালোবাসতে থাকুক।"
Monday, 22 February 2021
শশাঙ্কের মুদ্রা
তিয়া সকালে খবরের কাগজ পড়ছিলো।
হঠাৎ ওদের বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠলো।দরজা খুলে দেখে মিমি ও একজন ব্যক্তি, সৌম্যকান্তি চেহারার এক ভদ্রলোক।
মিমি ঢুকে বললো,“আমাদেরই খোঁজ করছিলেন পাড়ার লোকদের কাছে। আমি দেখে নিয়ে এলাম।”
তিয়া ভদ্রলোককে বললো,“আপনি বসুন, আমি আসছি।”
বলে তিয়া মাকে খবর দিয়ে এলো। বাবা আজকে কলেজে গেছেন। তাই বাড়িতে এখন তিয়া আর তিয়ার মা আছেন।
তিয়া এসে বললো,“বলুন আপনার সমস্যাটা।”
ভদ্রলোক গলা খ্যাঁকারি দিয়ে বললেন,“আমার নাম রাজেন্দ্র সরকার। আমি আগে কলেজে ইতিহাস পড়াতাম। তোমার বাবা আমার ছাত্র ছিলো।”
“আপনি প্রোফেসর সরকার না! বাবার মুখে আপনার নাম অনেকবার শুনেছি। বাবা এখন বাড়ি নেই, যদি থাকতেন আপনাকে দেখে খুব খুশি হতেন।”
“হ্যাঁ, সে জানি। কিন্তু আজ আমি আমার কটা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এসেছি। আগে তোমাদের কয়েকটা জিনিস দেখাই।” বলে কয়েকটা চিরকুট বার করলেন।
তিয়া আর মিমি সেগুলো হাতে নিয়ে দেখলো প্রথমটাতে লেখা,‘সাবধান!’। দ্বিতীয়টাতে লেখা,‘এবার প্রস্তুত হও!’। আরেকটাতে লেখা,‘যে অমূল্য সম্পদ তুমি হাতিয়েছ, তা তোমার জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।’
মিমি জিজ্ঞেস করলো,“সত্যি কি আপনার কাছে কোনো অমূল্য সম্পদ আছে?”
“আমি চার বছর হলো রিটায়ার করেছি। তারপর ইতিহাসের ওপর রিসার্চ করতে শুরু করি। আসলে শশাঙ্কের আমলের কিছু মুদ্রা এসেছিলো। যেগুলো কর্ণসুবর্ণতে পাওয়া গিয়েছিলো। কর্ণসুবর্ণ যে শশাঙ্কের রাজধানী ছিলো নিশ্চয়ই জানো?”
তিয়া বললো, “হ্যাঁ ইতিহাসে পড়েছি। এটা তো মুর্শিদাবাদের কাছে না?”
“হ্যাঁ। মুর্শিদাবাদে চিরুটি বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে।”
তিয়ার মা চা দিতে আসায় কথা বন্ধ হয়ে গেলো। মা এসে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেলেন।
প্রফেসর সরকার আবার বলতে শুরু করলেন,“তো যেটা বলছিলাম, ওই মুদ্রাগুলো আমি আমার এক সিনিয়রের কাছে পেয়েছিলাম। বলা যায় আমার গুরু। মৃত্যু হওয়ার আগে উনি আমাকে এগুলো দিয়ে যান। আসলে ওনার ইচ্ছে ছিলো এই বিষয় নিয়ে রিসার্চ করার। কিন্তু, ক্যানসার হওয়ার পর শরীর আর টানলো না, চলে গেলেন। কুড়ি বছর আগে আমাকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন আমি যাতে ওনার রিসার্চ সম্পূর্ণ করি। নিজে বিয়ে করেননি। কিন্তু আমাকে খুব ভালোবাসতেন।”
মিমি বললো,“হুম, আচ্ছা আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?”
“বাড়িতে আছে বলতে আমার চাকর মাধব, আর অ্যাসিস্টেন্ট রাজীব। মেয়ে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে, আর স্ত্রী পাঁচ বছর হলো গত হয়েছেন।” একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন,“আমি চাই আমার যদি এর মধ্যে কিছু হয়ে যায় এই পুরো ব্যাপারটার ইনভেস্টিকেশন তোমরা করবে। এই পুরো ব্যাপারটায় তোমাদের রাজীব সাহায্য করবে। আমি রাজীবকে বলে রেখেছি সব। আমাকে হয়তো এর মধ্যে কিডন্যাপ বা মেরে ফেলা হবে। আর আমার সাথে এই শত্রুতা আমার চেনা পরিচিতই কেউ করছে।”
তিয়া বললো,“আপনি এভাবে কেনো ভাবছেন? এমনও তো হতে পারে কেউ এগুলো মজা করে করছে। আমরা হয়তো এতে আপনার কোনো সাহায্য করতে পারবো না। কিন্তু আমরা কাল আপনার বাড়িতে নিশ্চয়ই যাবো।”
প্রোফেসর সরকার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,“ঠিক আছে, কাল এসো। আর এটা আমার কার্ড।” বলে একটা কার্ড বের করলেন। “এতে আমার ঠিকানা, কনট্যাক্ট নাম্বার দেওয়া আছে। যোগাযোগ করে নিও। এবার আমি উঠি।” বলে উনি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
উনি চলে যাবার পর মিমি বললো,“কি বুঝছিস তিয়া?”
তিয়া শুধু বললো,“ব্যাপারটা খুব প্যাঁচালো।”
পরদিন সকালে তিয়া সবে ঘুম থেকে উঠেছে। হঠাৎ করে মোবাইলে একটা ফোন আসে। তিয়া একটু অবাকই হয়। এত সকালে তো কেউ ফোন করে না সাধারণত।ফোন তুলে শুনতে পায় একটা মোলায়েম কন্ঠস্বর।
“হ্যালো, রুপকথা কথা বলছো?”
“হ্যাঁ বলছি। আপনি?"
“আমি রাজীব ঘোষ, প্রফেসর সরকারের সেক্রেটারি।”
“ও ,হ্যাঁ বলুন। প্রফেসর সরকার ঠিক আছেন তো?”
ওপাশ থেকে মনে হলো একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো।
“না। ওনাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে।”
তিয়া অবাক হয়ে বললো,“কখন? কীভাবে?”
“সব বলবো। কিন্তু তাহলে তোমাদের একটু এ বাড়িতে আসতে হবে। তাহলে ভালোভাবে গুছিয়ে বলতে পারবো।”
“নিশ্চয়ই, আমরা এক্ষুণি চলে আসছি।”
তিয়া ফোন রেখে মিমিকে ফোন করে সবটা জানালো। বাবা শোনার পর বাবাও যেতে চাইলেন। তিয়ারা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লো।
প্রফেসর সরকারের বাড়িতে গিয়ে দেখলো বাড়ির সামনে একজন বছর সাতাশের যুবক দাঁড়িয়ে। সে সামনে এগিয়ে এসে বললো,“আমার নামই রাজীব ঘোষ। তোমরা ভেতরে এসো।”
ওরা বাড়ির ভেতরে গেলো। বসার ঘরটা মোটামুটি ছিমছাম। ঘরে ঢুকেই একটা বড়ো সোফা। তার পাশে একটা বুককেস, যার বেশির ভাগটাতেই ইতিহাসের বই। সোফার সামনে একটা টি-টেবিল। তিয়ারা সোফাটাতেই বসলো। রাজীব বাবু একটা বেতের মোড়া এনে তাতে বসলেন।
রাজীব বাবু বললেন,“আপনারা কি খাবেন বলুন?”
তিয়া বললো,“না না সে সবের কোনো দরকার নেই। আপনি আমাদের শুধু সবটা খুলে বলুন।”
রাজীব বাবু বলতে শুরু করলেন,“স্যার প্রত্যেকদিন সকালে মর্নিং ওয়াকে যেতেন। কিন্তু আজ দেখলাম স্যারের ঘরের দরজা বন্ধ, ভেতর থেকে। স্যার পাঁচটার মধ্যেই প্রত্যেকদিন ঘুম থেকে উঠে পড়েন। কিন্তু আজ কেনো উঠলেন না বুঝতে পারছিলাম না। অনেকবার ডাকলাম সাড়া দিচ্ছিলেন না। তারপর আমি আর মাধবদা মিলে দরজা ভাঙলাম। দেখলাম স্যার নেই। একটা চিরকুট ছিলো। এই দেখো!”
রাজীব বাবু ওদের চিরকুটটা বের করে দেখালেন। তিয়া মিমি ভালো করে দেখলো। বাবাও ঝুঁকে পড়ে দেখলেন। চিরকুটে লেখা আছে, ‘প্রফেসর সরকার এখন আমার জিম্মায়।’
মিমি বললো,“আচ্ছা প্রফেসর সরকারের কাছে তো শশাঙ্কের আমলের কিছু মুদ্রা ছিলো। সেগুলো ঠিক আছে?”
রাজীব বাবু শুকনো হেসে বললেন,“স্যার যে সেগুলো কোথায় রেখেছেন আমি নিজেও জানি না। আর তাছাড়া যখন থেকে এই চিঠিগুলো আসতে শুরু করে তখনই স্যার বলেছিলেন এগুলো কোনো সুরক্ষিত জায়গায় রাখতে হবে। কারুর হাতের নাগালে যেনো না আসে। তারপর উনি কোথায় ওগুলো রেখেছেন আমি বলতে পারবো না।”
তিয়া বললো,“এই মুদ্রার ব্যাপারটা আর কে কে জানতো?”
রাজীব বাবু একটু ভেবে বললেন,“তেমন কারুর সাথে তো আলোচনা করেননি। তবে, যতদূর জানি ডক্টর আরিকুল আহমেদ আর প্রফেসর আশুতোষ রায়ের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন। আর কেউ জানতেন বলে তো মনে পড়ছে না। আসলে স্যার আমাকে সবকিছুই বলতেন। কার সাথে কি কথা হলো, কোথায় যেতেন, সব। আমায় খুব ভরসা করেন আসলে।”
এতক্ষণে বাবা মুখ খুললেন,“আমি ডক্টর আহমেদ আর প্রফেসর রায়কে চিনি। খুব বড়ো মাপের ইতিহাসবিদ এঁরা।”
তিয়া বললো,“বাঃ, তাহলে তো ভালোই হলো। আচ্ছা ওনার মেয়ের এসব ইতিহাসের বিষয়ে আগ্ৰহ আছে?”
রাজীব বাবু বললেন,“না, সৌমির এসব ব্যাপারে কোনো আগ্ৰহ নেই। পিওর সাইন্সের স্টুডেন্ট, দিল্লীতে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। খবরটা জানিয়েছি, আজকের রাতের ফ্লাইটে চলে আসবে।”
মিমি বললো,“আপনি কি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন? আর প্রফেসর সরকারের সাথে কতদিন আছেন?”
“আসলে আমিও ইতিহাস নিয়েই পড়াশোনা করেছি, ওই প্রাচীন বাংলার ইতিহাস নিয়ে। স্যারের রিসার্চের বিষয়ও ছিলো ওটাই। আসলে আমি এখনও পড়াশোনা করছি। আমার বাবা মা নেই। বছর চারেক আগে আমার বাবা মা একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। আমার বাবার এক বন্ধুর কাছে প্রফেসর সরকার এই বিষয়ে জানতে পারেন। তারপর উনি এখানে নিয়ে আসেন, তখন থেকে আমি এখানেই।”
তিয়া বললো,“লাস্ট কোয়েশ্চেন, এ বাড়ির চাকর মাধবদা কতদিন আছেন? আর পুলিশকে খবর দিয়েছেন?”
“যতদূর জানি, মাধবদা এবাড়িতে প্রায় পনেরো বছর আছে। আর পুলিশকে তো খবর দেওয়া হয়নি।”
“ঠিক আছে, পুলিশকে আপনি খবরটা দিন। ওনারা অনেকটা সাহায্য করবেন। আর পাশাপাশি আমরা ইনভেস্টিগেশন চালিয়ে যাচ্ছি। আর আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এতোটা সময় দেওয়ার জন্য। এবার এই বাড়িটা একটু ঘুরে দেখতে চাই, সাথে প্রফেসর সরকারের ঘরটাও দেখবো।”
রাজীব বাবু বললেন,“নিশ্চয়ই।”
তিয়া প্রফেসর সরকারের বাড়ি দেখে ফেরার পর বাবাকে বলেছিলো,“বাবা,তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। তোমার তো ডক্টর আহমেদ আর প্রফেসর রায়ের সাথে চেনাজানা আছে। আমাদের সাথে ওনাদের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দাও না। আমরা ওনাদের সাথে কথা বলতে চাই।”
বাবা বললেন,“হ্যাঁ, এ আর এমন কি ব্যাপার?”
তারপর যখন সন্ধ্যাবেলায় তিয়া পড়তে বসে ছিলো তখন বাবা খবর দিলেন যে কাল ডক্টর আহমেদ ওদের টাইম দিয়েছেন দুপুর একটা। কিন্তু মাত্র কুড়ি মিনিট ওনার সাথে কথা বলা যাবে। তারপর ওনা কে কোন সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে যেতে হবে। আর প্রফেসর রায় টাইম দিয়েছেন সন্ধ্যা ছটায়। সেই কথামতো ওরা এখন ডক্টর আহমেদের বসার ঘরে বসে আছে। আজ রাজীব বাবু ওদের সাথে এসেছেন। বাবার কিছু কাজ থাকায় আসতে পারেননি।
ডক্টর আহমেদের বাড়ির অবস্থা সত্যি খুব শোচনীয়। ড্রয়িংরুম পুরোটাই বইয়ে ভর্তি। একপাশে একটা ছোটো সোফা আছে। তাতেই ওরা তিনজন ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে। ডক্টর আহমেদ এসে একটা চেয়ারে বসে বললেন,“আমার কিন্তু হাতে বেশি সময় নেই। যা প্রশ্ন করার তাড়াতাড়ি করো।”
তিয়া শান্ত গলায় বললো,“আমরা বেশি প্রশ্ন করবো না। আপনার সাথে প্রফেসর সরকারের আলাপ কীভাবে হলো?”
ডক্টর আহমেদ খিটখিটে গলায় বললেন,“যেভাবে হয়, একটা সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়েই সরকারের সাথে আলাপ। প্রথমে আমার পিছনে ঘুরঘুর করছিলো। গায়ে পড়ে তো ও-ই প্রথম আলাপ করলো। সেদিনই তো বললো আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমিও টাইম জানালাম। তারপরই তো কিসব ওই মুদ্রার কথা বললো। আমি জানি এইসব গুজব। শশাঙ্কের আমলের মুদ্রা ওর কাছে আসবে কি করে!”
মিমি বললো,“আপনি কি এসবের জন্য প্রফেসর সরকারের ওপর হিংসা করেন?”
“থামো তো হে খুকি!” গর্জে উঠলেন ডক্টর আহমেদ। “আমি ওর ওপর হিংসা করতে যাবো কেনো!”
তিয়া বললো,“আপনি প্লিজ থামুন। ও মুখ ফসকে বলে ফেলেছে। আচ্ছা আপনিও তো প্রাচীন বাংলার ওপর রিসার্চ করছেন।ন্যাশানাল লাইব্রেরী থেকে আপনি কোনো এক দুর্মূল্য পুঁথি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন না? বাই দ্য ওয়ে আমাদের আর কোনো প্রশ্ন নেই। রাজীব বাবু চলুন।”
ডক্টর আহমেদের মুখটা দেখার মতো ছিলো।
রাজীব বাবুও এতক্ষণ স্তব্ধ দর্শকের মতো বসে ছিলেন। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। তিয়া দরজার কাছে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো,“আর মুদ্রার ব্যাপারটা আসল নাকি গুজব সেটা আমরা আপনাকে নিশ্চয়ই জানাবো, আসি।”
তিয়ারা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।
সেদিন সন্ধ্যা ছটায় তিয়ারা প্রফেসর রায়ের বাড়ি গিয়েছিলো। ভদ্রলোক ভালো মানুষ বলেই মনে হলো। প্রফেসর সরকারের কিডন্যাপিং-এ উনি খুবই চিন্তিত। ওনার কাছে গিয়েও তেমন কিছু পাওয়া গেলো না। উনি এই ঘটনাটায় প্রচন্ড ডিস্টার্বড। অবশ্য উনিও প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের ওপরই গবেষণা করছেন।
এখন অবশ্য তিয়া নিজের বাড়িতে, সঙ্গে মিমি আছে।
মিমি বললো,“প্রফেসর রায় কিন্তু খুব ভদ্র মানুষ। ডক্টর আহমেদের মতো খিটখিটে নয়।”
তিয়া বললো,“কিন্তু তিনিও এখন সাসপেক্টের লিস্টে আছেন। মোটামুটি চারজন এখন আমাদের সাসপেক্টের লিস্টে আছে। রাজীব বাবু, ডক্টর আহমেদ, প্রফেসর রায় আর প্রফেসর সরকারের চাকর মাধবদা। সৌমিদির ব্যাপারটা আলাদা। ও বাইরে থাকে, তাই ওর এখানে একটা অ্যালিবাই আছে। সৌমিদির সাথে কথা হলো। ব্যাপারটায় খুব ডিপ্রেসড। বললো, তোমরা যেভাবে পারো বাবাকে খুঁজে দাও। পুলিশের সাথেও কথা হয়েছে, সবরকমের সহযোগিতা ওরা করবে।”
তখনই তিয়ার মোবাইলে একটা ফোন আসে। তিয়া ফোনটা ধরে লাউডস্পিকারে দেয়। ওপাশ থেকে একটা ভারী কন্ঠস্বর বলে উঠলো,“প্রফেসর সরকারকে খুঁজছো! পাবে না, কোনোদিনও পাবে না।”
তিয়া বললো,“আপনি কি করে ধরে নিচ্ছেন আমরা পাবোনা? আর আপনি কে?”
“আমি কে সেটা যদি তোমাদের হিম্মত থাকে তো বের করো। কিন্তু এসব করতে গিয়ে খালি খালি বেঘোরে প্রাণটা যাবে। তার থেকে বরং মন দিয়ে পড়াশোনা করো। রাখলাম।”
তিয়া ফোনটা রেখে বললো,“একটা ফোনবুথের নাম্বার, বোঝাই যাচ্ছে।”
মিমি বললো,“এখন কি করবি? পুলিশকে জানাবি?”
“হ্যাঁ পুলিশকে তো জানাতে হবেই। আমরা তো আর একা একা এই লোকটাকে ট্রেস করতে পারবো না। আমি খুব ভালো করে ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। খালি কিছু প্রমাণের দরকার।”
মিমি উদগ্ৰীব হয়ে বললো,“এবার তাহলে একটু খুলে বল।”
তিয়া বললো,“সব বলবো। তার আগে বল রাত জাগতে পারবি তো? কাজ আছে একটা।”
রাত একটা বাজতে চললো। ঠান্ডা হাওয়া শনশন করে বইছে। ঠান্ডাটাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। অমাবস্যার রাত, চারিদিকটা অন্ধকার আর নিঝুম। হঠাৎ করে একটা ছায়া মূর্তি এসে দাঁড়ালো প্রফেসর সরকারের বাড়ির পেছনের পোড়ো বাড়ির সামনে। তার দু-তিন মিনিট পরে আরেকটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ালো। মনে হলো দ্বিতীয় ছায়ামূর্তিটা প্রথম ছায়ামূর্তির হাতে একটা বাক্স দিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে অনেকগুলো টর্চ জ্বলে উঠলো। টর্চের আলোয় দেখা গেলো প্রথম ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, প্রফেসর রায়। আর দ্বিতীয় ব্যক্তিটি রাজীববাবু।
পোড়ো বাড়ির সামনে একটা ঝোপের থেকে তিয়া মিমি উঠে আসলো।
তিয়া বললো,“থ্যাঙ্ক ইউ রাজীব বাবু। আপনাকে ছাড়া এ কেস উদ্ধার হতো না।”
রাজীব বাবু হেসে বললেন,“দ্যাটস মাই প্লেজার।”
ওই অন্ধকারে দেখা গেলো প্রফেসর রায়ের মুখটা লাল হয়ে গেছে। আর চারিদিকে ঘিরে ধরেছে প্রচুর পুলিশ।
তিয়া বললো,“তাহলে প্রফেসর রায়, হিম্মত আমাদের আছে তো? না থাকলে কিন্তু সত্যিই আপনাকে ধরা মুশকিল হতো।”
ভিড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর গোলদার। এই এলাকার থানার ইন্সপেক্টর। বললেন,“তোমরা ঠিকই বলেছিলে। প্রফেসর রায়ের বাড়ি থেকে আমরা প্রফেসর সরকারকে উদ্ধার করেছি। থ্যাঙ্ক ইউ তিয়া মিমি।”
মিমি বললো,“আমরা তাহলে প্রফেসর সরকারের বাড়িতেই যাই। সেখানেই পুরোটা সমাধান হোক।”
প্রফেসর সরকারের ড্রয়িংরুম এখন জমজমাট। সেখানে এখন আছেন ইন্সপেক্টর গোলদার, ডক্টর আহমেদ, রাজীব বাবু, সৌমিদি, তিয়ার বাবা, প্রফেসর রায়, মাধবদা এবং প্রফেসর সরকার। অবশ্যই তিয়া মিমিও আছে।
তিয়া বলতে শুরু করলো,“প্রফেসর সরকার আমাদের কাছে আসেন একটি বিশেষ সমস্যা নিয়ে। বিগত কয়েকদিন ধরে ওনার কাছে কিছু চিঠি আসছিলো। ফলে ভয় পেয়েই উনি আমাদের সাহায্য নিতে আসেন। ওনার কাছে শশাঙ্কের আমলের কিছু মুদ্রা ছিলো। ছিলো বলবো কেনো, আছে। চোরাই বাজারে এর দাম অনেকটা উঠবে। আর একজন ইতিহাসবিদের কাছে তো এটার দাম অনেকটাই। এই ব্যাপারটা উনি আলোচনা করেছিলেন রাজীব বাবু, ডক্টর আহমেদ এবং প্রফেসর রায়ের সাথে। এই চারজনের একটা বড়ো মিল ছিলো। এরা চারজনেই প্রাচীন বাংলার ইতিহাস নিয়ে রিসার্চ করছেন। রাজীব বাবু অবশ্য এ নিয়ে পড়াশোনা করছেন আপাতত। তাই এদের প্রত্যেকের ব্যাপারেই একটু খোঁজখবর নিলাম। রাজীব বাবু আমাদের যা বলেছিলেন সবই ঠিক। এর মাঝে ডক্টর আহমেদের ব্যাপারে একটা কথা শুনলাম। আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগে উনি ন্যাশানাল লাইব্রেরী থেকে কোনো পুঁথি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। কিন্তু তার মুদ্রার ওপর কোনো ইন্টারেস্ট নেই। কারণ তিনি মনে করতেন এই ব্যাপারটা গুজব। এমনিতেই ওনার মাথা খুব গরম, তাই মাথা ঠান্ডা করে ওনার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়।”
এবার মিমি বললো,“এবার আসা যাক প্রফেসর রায়ের সম্বন্ধে। এমনিতে প্রচন্ড মাথা ঠান্ডার মানুষ। প্রথম দেখার পরেই খুব ভালো মানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু ওই যে মুদ্রার কথা শুনে লোভটা চাগাড় দিয়ে উঠলো। আর তাছাড়া পাশাপাশি একটা বিজনেসও আছে, অ্যান্টিক জিনিসের। কি তাই তো!”
প্রফেসর রায় বলে উঠলেন,“এর প্রমাণ আছে তোমাদের কাছে?”
তিয়া বললো,“কেনো থাকবেনা? নিশ্চয়ই আছে। পুলিশ নিজে খবর নিয়েছে। আর আপনার অ্যান্টিক হাউজের কার্ড আপনার বাড়ি থেকেই পেয়েছি।”
মিমি বললো,“আপনি আর একটা বড়ো ভুল করেছিলেন। কিডন্যাপিং এর সময় যে চিঠিটা দিয়েছিলেন, সেটা তো আপনি নিজের হাতে লিখেছিলেন। সেই হাতের লেখা আর আপনার হাতের লেখা তো হুবহু এক। ঘরে আপনার নোটবুকটা ফেলে গিয়েছিলেন আর সেটাই আমাদের কাজে লাগলো।”
“আর আপনি সবচেয়ে বড়ো ভুলটা করেছিলেন আমাদের ওই হুমকির ফোনটা করে। আপনি যে টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করেছিলেন সেই টেলিফোন বুথের ছেলেটি নিজে আপনার বর্ণনা দিয়েছে। আর আপনার গালের ওই বড়ো আঁচিল টা কি কেউ ভুলতে পারে! ওটা আপনার চেহারারও ব্ল্যাক স্পট আর জীবনেরও। এই বাড়ির দরজা খুলে প্রফেসর সরকারকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন আপনি। সাথে অবশ্য মাধবদাও ছিলো। দরজা তো মাধবদাই খুলে দিয়েছিলো।”
মাধবদা তখন চিৎকার করে বললো,“এর প্রমাণ কি?”
মিমি তখন হেসে বললো,“সাক্ষী প্রফেসর সরকার নিজে আর প্রমাণ তোমার হাতের আচঁরটা। ধস্তাধস্তি করতে গিয়েই ওটা হয়েছে। যতোই ওটা লুকোনোর চেষ্টা করো না কেনো, আমাদের চোখে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল।”
প্রফেসর সরকার ধরা গলায় বললেন,“মাধব আর আশুতোষ যে এটা করতে পারে আমি ভাবতেও পারছি না। আশুতোষ আমার ভাইয়ের মতো ছিলো। কিন্তু রাজীব তখন আশুতোষকে ডেকেছিলো কেনো?”
তিয়া বললো,“এর উত্তর আমি দিচ্ছি। আসলে আমিই রাজীব বাবুকে বলেছিলাম যাতে উনি ফোন করে প্রফেসর রায়কে বলেন মুদ্রাগুলো ওনার কাছে আছে। আর উনি সেগুলো প্রফেসর রায়ের কাছে বিক্রি করবেন। লোকেশন বলেছিলেন আপনাদের বাড়ির পেছনের পোড়ো বাড়িটা। একটা বাক্স নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে ছিলো মাটি। রাজীব বাবু যদি না থাকতেন তাহলে খুবই মুশকিল হতো আপনাকে খুঁজে বের করা। ইন্সপেক্টর প্রফেসর রায় আর মাধবদাকে নিয়ে যান।”
পুনশ্চ- মুদ্রাগুলো প্রফেসর সরকার কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন সেটা বলেননি। তবে মুদ্রাগুলো তিয়া, মিমি, তিয়ার বাবা আর অবশ্যই ডক্টর আহমেদকে দেখিয়েছিলেন। তার উজ্জ্বলতা ঠিকরে বেরোচ্ছিলো। আর তাছাড়া একটা খুশির খবর আছে।সৌমিদি আর রাজীব বাবু নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলে প্রফেসর সরকার তাদের দুজনের বিয়ে দেবেন
ঠিক করেছেন। আর নিজের গবেষণাটাও সফল ভাবে শেষ করবেন।
সৃজা ও অদৃজা সরকার
একটা অবয়বের জন্য
আঁধারের গা বেয়ে আর 'একটা' রাত নামে,
স্লিপিং পিলের হুমকি এড়িয়ে নিরাশ বলিরেখাগুলো,
সারা মুখে কাটাকুটি খেলে, চোখের কোলে তুলে দেয়,
জ্বলন্ত স্বপ্ন-চিতার নিভে যাওয়া নরম ছাই।
তবুও চিড় ধরা ফ্রেমের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,
পঁচিশটা মায়াবী বিকেল আজও কোমর বেঁধে কুমিরডাঙ্গা খেলছে হিজলতলে,
ছেলেমানুষী করা গাঙচিলটা দু-টাকার বৃষ্টি এনে মাখিয়ে দিচ্ছে গায়ে,
ঐ তো ধূপকাঠি পুড়ছে, ভেসে আসছে মুড়ি-বাতাসা চেবানোর খসখসে শব্দ!
তুলসিতলার সন্ধ্যে-প্রদীপটা চুপটি করে সাক্ষী দিচ্ছে এখনো।
আর মায়ের হাতে রাঁধা সুক্তোর, গরম তেলে ভাজা পাঁচফোড়নের গন্ধটা..
হঠাৎ সব রঙিন অতীতগুলো চুপ করে স্মৃতির ঝুলিতে ঢুকে পড়ে,
পাঁজর ভাঙ্গা হুইলচেয়ারের পাশ দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়,
নাকের ভেতরে গুঁজে দেয় মৃত্যুফুলের সুবাস।
কোটরগত অর্ধমৃত স্বপ্ন ঠেলে, আধবোজা চোখে,
হসপিটালের কলমটাকেই ধরেছি অসাড় হাতে,
শুধুই নিজের অবয়ব বাঁচানোর লড়াই, ছায়াটার আয়ু বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা!
না, তা আর হবেনা, সময় যে আমাকে জন্মদিন আর দেবেনা!
মোমবাতিরা বুঝি নিজে নিজেই নিভতে শিখে গেছে?
এবার আলতো শরীরে পালকের মতো উড়িয়ে দিতে হবে শেষ নিঃশ্বাসটাকে।।
শ্রীতমা মন্ডল
শেফালী
স্বেত কোমল সুগন্ধি শেফালী পুষ্প,
নিঃস্বঙ্গ জীবনের সমস্ত অভিলাষা ভগ্ন,
একাকী রাত্রের অল্প আয়ুষের পুষ্প,
প্রাণসঙ্গি প্রেমিক মধুকর মিলনে মগ্ন!!
স্বেতবর্না পুষ্পের রেশমি পুষ্পদল,
নিবিড় বাহু বন্ধনে আবদ্ধ ভৃঙ্গবর,
ব্যাকুল স্পন্দনে একাকার প্রাণে,
লিপ্ত হয়েছে প্রেমের উষ্ণ আভরণে!!
জ্যোৎস্না বিধৌতে যামিনীর জাগরণে,
প্রণয়াসিক্ত সুমনের কম্পিত শরীর,
মোহাবিষ্ট প্রণয়নী শেফালীর নিশির ক্ষণে,
হারিয়েছে মধুভাণ্ডার পেয়েছে জীবনসার!!
সূর্যের আগমনে বিচ্ছেদের সংকেত নিকটে,
নিশিগন্ধা বিলপে প্রাণেশ্বরের সন্নিকটে,
বৃন্তচ্যুত কুসুমের মূল্যহীন প্রাণ বিলপে অকুলে,
ক্রন্দন গুঞ্জরে ঘঞ্চপ্রান্তে দিগন্ত বিস্তরি ব্যাকুলে!!
নিশিগন্ধা অশ্রু ফেলে ভোরে প্রভু চরণ সুমরে,
ব্যর্থ জীবনে ঠাকুরের দর্শন বিনে বিলপি মরে,
অসহায় পুষ্প ঝরে পড়ে শুকনো পাতা উপরে,
অল্প আয়ুষে কিছু ব্যর্থ যায় না জীবন তারে!!
অল্প আয়ুষেও সুগন্ধ বিচ্ছুরিত করে বন প্রান্তরে,
ধন্য শেফালী তুমি পথিক প্রাণে ভরো আনন্দ অন্তরে,
আমিও মুগ্ধ তোমার সৌন্দর্য সুগন্ধে এই নির্জন ঘন বনে,
তুলেছি আমি অঞ্চলে তোমায় অর্পণ করবো বলে কৃষ্ণ চরণে!!
মেনকা রানী ধুরুআ (নীহার)
এখন মধ্যরাত
এখন মধ্যরাত অস্পষ্ট চিরাগ ,
পর্ণমোচিতে স্পষ্ট , ঝরে যাওয়া চিরনিদ্রার দাগ !
নিঃসঙ্গতা ঘিরেছে ভীষণরকম ভাবে আয়নায় বাঁকা মুখ, ভালোবাসা চন্দ্রগ্রহনে খুঁজে বেরোচ্ছে চিলেকোঠার মতন সুখ /
শারীরিক স্রোতের উষ্ণতা , গোসল সেরে ধানক্ষেতে যন্ত্রনা / গোলকধাঁধা জীবন , তাতে আবার জোড়াতালি দেওয়া সেপ্টিপিন /
কলম হলে কালি নেবো ,
একগাল বিষ মেখে বিষাক্ত এঁচরে পাকা হয়ে একঘরে রবো / এঁটেল মাটিতে ভিটে গড়ে নিজেই বিরক্ত হবো /
লক্ষীছাড়া প্রজাপতি কাঠখোট্টা গাছে আদিম স্বপ্ন / দুহাতের আদবকায়দায় বেকায়দা আত্মমর্যাদা /
তোমাকে বলিনি টেবিলে রাখা গোলাপ নিতে / যা বিক্রি হয়েছে আজ, দজ্জাল ঘড়িটা মানুষ চিনিয়েছে সঠিক তাই /
ফিরে এসো ঘুমোবোর আগে, শোবার ঘরে পুড়ে যাওয়া নেলপলিশ /অক্লান্ত পরিশ্রমে ভিজে যাওয়া কোলবালিশ জানে , সময়ের কাছে হেরেছে প্রেমিক বাজি , এখন মধ্যরাত কথা বলা বন্ধ /
হৃদপিন্ড সচল কাঁটাতারের বেড়ায় অনেককিছুই শুধু নেই আঁচল ,
আমরা ডিসেম্বরে তোমার জানুয়ারি র ভোর চাই, সবকটা মুহূর্তের মধ্যরাতের খাতা ক্লোসড চাই , এখন মধ্যরাত শপথ এনেছি কুঁড়ি ফুটিয়ে বুড়ি হবে জন্য....
কলম বাবু
বৃক্ষের বৃদ্ধতায়
তটরেখা বোধহয় নদীর সীমান্ত ,
নিঃস্ব প্রলেপে যাহা কিছু সম্মুখ তাহা -
দানকৃত অথবা ভিক্ষাবৃত্তি ,
শ্লেয়সীতা অথবা শ্লেষ যদি বিরূপ হয় ,
অনুরূপ তবে কি তোমার বৃদ্ধতা ?
ওহে মনিষী , মহিয়সী তোমার যাতনা ছিল -
হবে হয়ত অধিক , ততোধিক , শতাধিক ।
রূপকী কথা হল -
যারা দুঃস্থের কারারসে -
নোনতা হয়েছে বৎসরের সমুদ্রে ,
তোমাদেরকে অজানা আসলে -
অজ্ঞতা বা অনুর্বর মস্তিষ্ক ।
অন্বেষা , কলম যদি তোমার দেওয়াল লিখন হয় ,
তবে পতাকা হাতে ভিড় সমাজতন্ত্রের বক্তাদের ,
ঘর জ্বলে , জ্বলনে পেট ও পোড়ে -
ভালোবাসা , নেহ করে মৃত , মৃত সমগ্র যাহারা ,
তাহারা অবিলম্বে বিদ্রোহী হয় না পাওয়ার বিলম্বে ,
রাত্রি রাত্রি নিঃশব্দ অথবা নিশীথের শব্দ ,
কিয়ৎক্ষণ ভুলিয়ে রাখা বা থাকার অভিপ্রায় ,
তটরেখায় ফিরিয়া চাহি ,
অনেকের জমায়েত ,
কেহ কি নাম লিখিয়াছে ,
উন্মাদের বৃক্ষের বৃদ্ধতায় ।।
শুভ ভট্টাচার্য
শুকনো ময়ূরাক্ষী
লালমাটির এক রূপরাজ্যে, অনেক দূরে ঘর,
আকাশকালো চুলের মেঘে, ময়ূরাক্ষীর চর...
এই তো সবে অষ্টাদশী, স্কুলগন্ডি পার,
স্বপ্ন অনেক গুমরে মরে! কি আসে যায় কার?
কাদের বাড়ি? ঘোমটা ঢাকা, কিই বা তার কাজ..
বোঝার আগেই নতুন বৌয়ের, হাত বদলের রাজ।
কেউ চেনে না, মা কি বাবা, সবাই হল পর !
রামের বোতল ভীষণ দামি, সস্তা শুধু চড় !
রক্তে ভেজা আকাশ কালো, রক্ত মাখে শাড়ি।
রক্তমাংসে মানুষ হলেও, কালশিটেতেই "নারী"
রোজের নামচা মরতে মরতে, লাশের ওপর লাশ....
তবু মরার আগে শ্বাসটা ফেলার, পায়না অবকাশ।
শুকনো দীঘি, ময়ূরাক্ষীর জলের ঘরে রাহু,
বরটা ছাড়া বিষ ছুঁড়েছে, বাদ বাকি সব বাহু।
শেষে একদিন রক্তপিশাচ, হাল ছেড়ে দেশ পার...
পুলিশ আর এনজিওদের, হোমে বসত তার...
তার কথা তো সবাই জানে, মন্ত্রী থেকে প্রেস।
"কি ধরে নেয়? ", "হোমের কোনে মরে বাঁচাটাই শেষ?"
পোড়া মনের অভিশাপেতে, বিষাক্ত হোক লক্ষ্মী!
কবে পুরবে টইটই জলে, শুকনো ময়ূরাক্ষী।।
সুগত বড়ুয়া (প্রিয়)
যৌণাশ্রু
তোমার ওষ্ঠের স্পর্শে
আগুন জ্বলে,
আদরে ওঠে ঝড়।
তোমার দেহের ঘ্রাণে ঘ্রাণে মিশে রয়েছে
হাজার মানুষের মৃত্যুর দাগ।
তোমার এক বিন্দু অশ্রুতে
সৃষ্টি হয়েছে বিষাদ সাগর।
তোমার চাহনিতে রয়েছে
হাজার না বলা কথা।
এক স্তনে মিটিয়েছ শিশুর ক্ষুধা,
আর এক স্তনে যৌন তৃষ্ণা।।
অমৃতা মোদক
সেই নক্ষত্র
এক শরতে ঘরে ফেরা
কয়েকটা ধানসিঁড়ি ভেঙে বাড়ি ফিরে এসে শঙ্খচিলের মতো ডানা ঝাপটাতে ইচ্ছে হয়না।
মাঝেমধ্যেই মনকেমন করে মনেহয় এ জীবনটায় যদি একটা কাশবনের জন্মান্তর পেতাম।
যেখানে আকাশে মুক্তির বাঁশি মৃত্যুর বুক ছিন্নভিন্ন করে মেঘের পুকুরে ডুব সাঁতার দেয়!
বাড়ির পাশের আলপথ ধরে হুম না হুম না শব্দে একটা পালকি চলে গেল।
বাড়ির মেয়ে রাজবধূ বেশে শিউলিতে রাঙা সীমন্তিনী।
তখন আনচান করা বুকটায় বাজে এক শরতে ঘরে ফেরার রেলগাড়ির পদধ্বনি।
পূবের দিক থেকে একটা জটা মাথায় কয়লায় আঁচে ছুটে আসে বেচারা।
আমার তবু রেলস্টেশনেই হাঁফধরা জীবন,
ঘরে ফেরার আকুতিতে মহামারীর প্রলেপ অনেক হেঁটেছি সেই দিগন্তের বেনামী উপত্যকায়।
এবার নীল শালুকের দীঘিতে নিশ্চিত জীবন লিখতে চাই।
চেনা আগমনীর সুরে মৃত্যুর আঁচলে লেগে থাক অচেনা জ্বলন্ত শলাকা।
আমি ফিরে আসি এক শরতের পদ্মপাতায় লেখা গল্পে শিশিরভেজা বাড়ির পথে....
শ্রীপর্ণা নাথ
ভ্রূণ মাঝে একটি প্রাণ
মেয়েটি বোঝে না পিরিয়ডসের অর্থ
ছেলেটি জানে না কি হয় দাম্পত্য
অল্পবয়সে তারা ডুবে শরীরী প্রেমে
থাকতে চাইনি এই সুখ হতে ব্রাত্য,
পরিণাম স্বরূপ গর্ভে এলো প্রাণ
কে দেবে তারে নব জীবনদান?
"এতো নিছক ভুল", কহে ছেলেটি
লজ্জায় মাথা হেঁট নিশ্চুপ মেয়েটি,
কলঙ্ক হতে মুক্তির পথ খুঁজে পেতে
তারা নিলো বেছে পথ গর্ভপাতে
জন্মের পূর্বেই ঝরিলো তাজা প্রাণ
সংকট মোচন হলো, বাঁচিলো সম্মান,
ছেলেটি হয়তো আজ ভুলেছে সব
মেয়েটিও গড়েছে তাঁর নব সংসার
এসবের মাঝে জাগে প্রশ্ন একটাই
খুবই দরকার কি এই ভ্রূণ হত্যার?
বিপ্লব
Friday, 19 February 2021
Monday, 15 February 2021
ভালোবাসার নিয়ম
হীরে মানেই কিন্তু কয়লা নয়
কিন্তু কয়লা মানেই কালোহীরেঠিক যেন তেমন করেই ভালোবাসা সর্বদা ভালোলাগা হয়
কিন্তু কেবলই ভালোলাগারা সহজে ভালোবাসা হয় না
তুমি কখনো ভালোবেসেছ প্রিয়?ভালোবেসেছ কোনো মানুষকে?শরীর ভিজিয়েছ কখনো কোনো হৃদ-পুকুরে?!
ভালোবাসা হল এক আলাদা অনুভূতি
ফুসফুস হৃদয়ের মাঝে এর বসবাস
যখন ভালোবাসার ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধবে তোমার ফ্যাপসা-হৃদের মাঝে
তখন দেখবে,হৃদঘরে ভূমিকম্পের মতো ধুকপুকানির ঘনঘটা দেখা দেবে আর ফুসফুসীয় ধমনীর বারান্দা থেকে ঘনঘন শ্বাসের ফুৎকার আসবে
হয়তো এই ভালোবাসা
তুমি যদি কাউকে কখনো ভালোবাসো প্রিয়
তাহলে দেখবে তার পায়ের মোজার ঘেমেলি বিদঘুট দুর্গন্ধও তোমার নাকে জান্নাতি খোশবু হয়ে প্রবেশ করবে
তার নাকিকান্নাও তোমার কাছে বাঁশিয়াল সুর হয়ে যাবে
তার কথায় কথায় ঝগরুটে মনোভাবকেও তুমি তখন চিল্ডিশ নেচার বলে কাটিয়ে দেবে
তার ছোট ছোট বদভ্যাসগুলোও একসময় তোমার খুব প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করবে
তার ভালো-খারাপ উভয়কেই তোমার ভালোলাগতে শুরু করবে তখন
হয়তো এটাই ভালোবাসা
মনের ঘরে যখন একটা ছোট্ট অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ফোটে তখন সেটার নাম দিও ভালোলাগা
আর এই একটা স্ফুলিঙ্গই খন্ডবিখন্ড হয়ে যখন আরো শতাধিক ফুলকিতে ছেয়ে যায় আপাদমস্তকের চুল হতে পদনখ অবধি,ফুলকিগুলো অগ্নিপিন্ড থেকে দাবানল রূপে বিম্বিত হয়...তখন এই দাবানলটার নাম দিও ভালোবাসা
তোমার যদি কাউকে ভালো লাগে তবে তার সমস্তটাকেই তোমার কখনো ভালো লাগবেনা প্রিয় যদি না তুমি তাকে ভালোবাস!
কিন্তু তোমার আনকালচার ভালোবাসার মানুষটার কোটি কোটি বদভ্যাস আর বাজেস্বভাবও তোমার বড্ড বেশি ভালোলাগবে তখন যখন তুমি তার প্রেমে পড়বে
হয়তো তার পছন্দের তোমার অপছন্দের ঘৃণিত নীলরঙা শাড়িটাই তুমি নিজে হাতে একদিন কিনে আনবে তার জন্য,যে নীলরংকে একসময় তুমি সহ্যই করতে পারতেনা।
তাই শুধু তার ভালোদিকটাকে ভালোলাগাটাই ভালোলাগা,
আর ভালোমন্দ উভয়টাকে ভালোলাগাই হলো যেন সত্যিকারের ভালোবাসা
তাই যেমন সকল আকরিকই খনিজ কিন্তু
সকল খনিজই আকরিক নয়
ঠিক তেমনই সব ভালোবাসাই ভালোলাগা কিন্তু সব ভালোলাগাই ভালোবাসা নয়!
Sunday, 14 February 2021
মনে পড়ে যায় সেই হৃদয় দেবার তিথি দুজনার দুটি পথ মিশে গেল এক হয়ে নতুন পথের বাঁকে।
মনে পড়ে যায় সেই মন দেওয়ার তিথি, আজও মনে আছে সব, ভুলতে পারিনি অনেক সময় গেছে বিতি । সেদিন ছিলো পূর্ণিমা রাত যেনো জ্যোৎস্না স্নাত প্ৰহেলিক...
-
তটরেখা বোধহয় নদীর সীমান্ত , নিঃস্ব প্রলেপে যাহা কিছু সম্মুখ তাহা - দানকৃত অথবা ভিক্ষাবৃত্তি , শ্লেয়সীতা অথবা শ্লেষ যদি বিরূপ হয় , অনুরূপ ...
-
অনুগল্প - বালি ঘর। মিনাক্ষী পাতি । আমি যখন ছোট ছিলাম একবার বন্ধুদের সাথে নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমি সেদিন নদীর পাড়ে একটা বালিঘর করে...








