গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখটা লেগে গিয়েছিল, তা আর মনে নেই তার।যখন সে চোখটা খোলে তখন তার চারপাশে শুধুই অন্ধকার।এত গাঢ় অন্ধকার কখনও দেখেনি সে।তাই চোখ সয়ে আসতে একটু সময় লাগছিল।আর ততক্ষণে সে হাত দুটো এদিক সেদিক নাড়িয়ে বুঝে নিতে চেষ্টা করছিল আশপাশের পরিস্থিতি।
প্রায় মিনিট খানেক পর পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও খানিকটা ঝাপসা ঝাপসা ভাবে দেখতে পায় চারিদিকটাকে।তার মনে হয় সে এতক্ষন ধরে কোন একটা বদ্ধ ঘরে বসে আছে।চিন্তাটা মাথায় আসতই খানিকটা নিশ্চিত হওয়ার জন্যই হয়তো হাতটাকে পেছনে নিয়ে ঠাহর করতে চায় তার অবস্থান।আর ঠিক তখনই তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়।
" একি! আমি কোথায়? "
হামাগুড়ি দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে যায় সে।হাতটা তুলে ধরে চোখের সামনে।কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না।কিন্তু হাতে লেগে থাকা গুঁড়োগুলো আর চটচটে তরলটা সে অনুভব করতে পারছে।কী মনে হতেই আঙুলের ডগাটা আলতো করে জিহ্বায় চোঁয়ায়।আর সঙ্গে সঙ্গে একটা তড়িৎ প্রবাহ গিয়ে সজোরে আঁচড়ে পড়ে করোটির ভেতর থাকা মাংস পিন্ডটার উপর।একটা উৎকট নোনতা স্বাদে মুখটা বিকৃত হয়ে যায় তার।একদলা থুতু আর বমি নিজে নিজেই যেন বেরিয়ে আসতে চায় পেটের ভেতর থেকে।
কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে।কীভাবে সে এলো এ ঘরটায়?কে-ই বা আনল তাকে এখানে? কেনই বা আনল?
প্রশ্নগুলো এক এক করে জট পাঁকাতে শুরু করে তার মাথার ভেতর।আর তার সাথে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে সে তলিয়ে যেতে থাকে একটা ঘোরের সাগরে।
চোখ,কান,নাক সবকিছুতেই যেন এক এক করে তালা পড়ে যেতে থাকে।বুকের উপর যেন চেপে বসতে থাকে একটা ভারি পাথর।কী এক অসহ্য যন্ত্রনা!চারিদিকে শুধু ' ঝি…ঝি… ' শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না সে।একটু আগের ঝাপসা ঝাপসা দৃশ্যগুলোও ধীরে ধীরে মিইয়ে যেতে শুরু করে,চোখের সামনে নেমে আসে অন্ধকার পর্দা।
কতক্ষণ সে ঘুমিয়ে ছিল তা তার মনে নেই।কিন্তু যখন সে চোখ খোলে তখন তার আরও একবার অবাক হওয়ার পালা।
তার চারপাশের দৃশ্যপট রাতারাতি বদলে গিয়েছে।সেই অন্ধকার বদ্ধ ঘরটা এখন আর নেই।বরং,তার জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে ময়লা আর আবর্জনায় ঠাসা একটা উন্মুক্ত প্রান্তর আর একরাশ পচা,গলা,বাসি জিনিসের উৎকট গন্ধ।সেই গন্ধ তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে নিয়েছে।শত চেষ্টা করেও সে উঠে দাঁড়াতে পারে না।যতবারই সে উঠে দাঁড়াতে চায় এগুলোর মধ্যে থেকে,ততবারই আগের চেয়ে আরও বেশি শক্ত হয়ে উঠে সেই বাঁধন।আবার সে এলিয়ে পড়ে এই ময়লা আবর্জনার উপর।
একটু আগের সেই বদ্ধ ঘরের অসহ্য যন্ত্রণাটা ফের চাগাড় দিয়ে উঠে।বুকের উপর চেপে বসা পাথরটার ভারও যেন আরও একটু বেড়ে যায়।সঙ্গে আবর্জনার উৎকট গন্ধটাও এক অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে তার ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের উপর।
হঠাৎ করে একটা প্রকট রকমের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তার।মনে হতে থাকে কিছু একটা চেপে বসছে গলার উপর।ফুসফুসটাও ফেটে যাওয়ার উপক্রম।তীব্র যন্ত্রণায় সে খামচে ধরতে চায় আবর্জনার স্তুপ।ঠিক এমন সময় আঙুলের ডগাগুলো ভিজে উঠে কোন এক অজ্ঞাত তরলের স্পর্শে।তারপর,কিছু বুঝে উঠার আগেই এক প্রকাণ্ড ফোয়ারা আবর্জনার স্তুপ ভেদ করে শূন্যে ভাসিয়ে দেয় তাকে।এর পরক্ষণেই, শুধু একটা 'ঝুপ…' শব্দ।এরপর আর কিচ্ছু মনে নেই তার।
যখন সে চোখ মেলে তাকায় নিজেকে নিজের খাটেই আবিষ্কার করে।আশেপাশে চোখ ঘোরাতেই দেখতে পায় মা-বাবা,কাকা-কাকিমা সহ পরিবারের সকলকে।সকলেই উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে।একটু উঠে বসার চেষ্টা করতেই মাথার পাশে বসে থাকা ঠাকুমা বাঁধা দেয় তাকে।পায়ের কাছটায় যে বন্ধুটি বসে আছে সেও হাঁক পাড়ে,
''কি করছিস!উঠিস না।এখন খানিকক্ষণ বিশ্রাম কর।উফ…,যা ধকল গেল এতক্ষণ ধরে।''
''কি হয়েছে আমার? আর আমি ঘরেই বা এলাম কী করে!'' বলে অবাক আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকায় সে।
'' অ্যাঁ..হ.., বাবুর কথা শোন।তা তুই এখানে আসবি না তো কোথায় আসবি,মর্গে?'' ছেলের প্রশ্ন শুনে খেঁকিয়ে উঠে বলে তার বাবা।
''মর্গ!'' বেশ অবাক হয় সে।''মর্গ কেন?'''
এর উত্তর দেয় তার বন্ধু।সে বলে, ''তা, মর্গে যাওয়ার মত কাজ করলে সেখানে না গিয়ে আর উপায় কি,হ্যাঁ?অত রাতেরবেলা তোকে কে বলেছে গাছতলায় গিয়ে ঘুমাতে?ঘরে কি ঘুমানোর জায়গার অভাব পড়ছিল?''
''কেন,তাতে কী হয়েছে?'' আরও একটু অবাক হয় সে।
ফের খেঁকিয়ে উঠে তার বাবা, " ছেলের কথা শুনেছ?সে আবার প্রশ্ন করছে,'কী হয়েছে তাতে?'বলি, পড়াশোনা কি সব ভুলে মেরে দিয়েছ?উদ্ভিদবিজ্ঞানে যে 'শ্বসন' নামে একটা চ্যাপ্টার আছে তা মনে আছে তো? "
" শ্বসন! তাহলে ঐগুলো কী… " মাথার ভেতরটা আবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে তার।
মো. তানভীর রাশিদ